বাংলাপ্রিয়বিভাগ
সেই চেনামুখ · পর্ব ০২

পর্ব ০২

লেখার আকার

সেই লন্ডন – সোঁদো পেইভমেন্ট, টিপটিপ বৃষ্টি, হঠাৎ চমকে-দেয়া মেঘের গর্জন। পেইভমেন্টে ছোটবড় গর্ত, মৃদু শ্যাওলা, জমে থাকা জল।

স্কুল থেকে ফেরার পথে তাতে রেইনবুট পায়ে বন্ধুদের সাথে হৈহৈ খিলখিল লাফালাফি করতে করতে জামাকাপড়ের বারোটা বাজানো।

এখুনি পাশ থেকে মা বলে উঠবে, ‘আব্বুসোনা আর লাফায় না, আর লাফায় না, আর না!‘ কিসের কি! ঠান্ডা বাতাসে বায়ুমন্ডল উজাড় করা অক্সিজেন – আমি বড় একটা শ্বাসের সাথে টেনে নেব ফুসফুসের গভীরে। তারপর আবার বন্ধুদের সাথে চিৎকার লাফালাফি, যতক্ষণ পর্যন্ত না গার্জিয়ানরা হাত ধরে টেনে নিয়ে যাবে যে-যার বাড়িতে।

ঠিক তখনই আমার খেয়াল হবে, বাবা আজ ছাতা নিয়ে অফিসে যায়নি। বাসায় ফিরতে ফিরতে সে তো ভিজে যাবে! আমি ভিজে যাচ্ছি, আমাকে সামলাতে গিয়ে মা-ও ভিজে যাচ্ছে – তাতে কিচ্ছু যায় আসে না, বাবা ভিজে যাবে সেই টেনশনে আমি কান্না শুরু করে দিতাম। অনেক বুঝিয়ে-শুনিয়ে মা আমাকে নিয়ে ঘরে ফিরতো।

সেই পুরানো কার্পেটের গন্ধ, ভাড়া বাসা, ফ্রিজ, দোতলা থেকে নিচে নামার সিঁড়ির হাতলটা। বেডরুমের দেয়ালের এক সাইডে রেডিয়েটর ছিল না? ছিল তো। তাই না?

(পরিণত বয়সে আমরা যাকে স্মৃতি বলি – তার কতটা আসলে সত্যি, আর কতখানি অনুমান?)


নিচতলায় থাকতো আমাদের সিলেটি বাড়িওয়ালা – সাত্তার সাহেব, উনার স্ত্রী, এবং তাদের বিভিন্ন সাইজের চার পোলাপান। সবচেয়ে ছোট মেয়েটা ছিল আমার চেয়ে বছরখানেকের বড়।

নাম রিফা।

রিফার সাথে আমার ছিল দা-কুমড়া সম্পর্ক। ওর যে কি পরিমাণ মার খেয়েছি, হিসাব নাই। শেষের দিকে অবশ্য একটা অব্যর্থ অস্ত্র পেয়েছিলাম – একটা দাঁত বের করা প্লাস্টিকের গোরিলা। সেই গোরিলা দেখলে রিফা সাক্ষাৎ আযরাইলকে দেখার মতো একটা চিৎকার দিয়ে কান্নাকাটি শুরু করতো।

বলা বাহুল্য, জীবনের এই পর্যায়ে আমার প্রিয় খেলা ছিল সিঁড়ির কাছে রিফার অপেক্ষায় ঘাপটি মেরে বসে থাকা, আর সুযোগ বুঝে গোরিলা নিয়ে হুংকার দিয়ে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়া।

রিফাদের রান্নাঘরে – না, ওদের পুরা বাসাতেই আসলে – সবসময় মশলার গন্ধ লেপ্টে থাকতো। বেশিরভাগ‌ বাঙালি বা সিলেটি বাড়িরই অবশ্য একই অবস্থা ছিল। দেশি রান্না যে আমাদের বাসাতে হতো না, তা না। কিন্তু মা – যাকে আমি ঐ আমলে ‘মামি‘ বা ‘আম্মু‘ বলতাম – এসব ব্যাপারে খুব সতর্ক থাকতো। জানালা খুলে, এয়ার ফ্রেশনার ব্যবহার করে সে আগেভাগেই গন্ধ জিনিসটাকে লাইনে রাখতো।

তবু কিভাবে কিভাবে যেন আমাদের রান্নাঘরে সবসময় পাউরুটি আর কর্নফ্লেক্সের হাল্কা একটা ঘ্রাণ থাকতো। ছুটির দিন সকালে আমরা একটু বেশি সময় নিয়ে নাস্তা খেতাম। বাবা খুব আগ্রহ নিয়ে অরেঞ্জ জুস খেত। অরেঞ্জ জুস তার খুব প্রিয়।

কালে-ভদ্রে মা‘র শুটকি খাওয়ার সাধ হতো। সেই গন্ধে আমার অন্তরাত্মা গুলিয়ে আসতো। ঐসব দিনে মা নিজে আর জানালা খোলার চান্স পেত না, আমিই ইয়াক ইয়াক করতে এয়ার সার্কুলেশন বাড়ানোর জন্য যা যা করা সম্ভব করতাম। আর কমপ্লেইন করতে করতে সবার মাথা খারাপ করে দিতাম। মা তখন অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে বাংলায় দীর্ঘশ্বাস ছাড়তো – ছেলেটা বেশি বেশি বিলাতি হয়ে যাচ্ছে।

বড় হয়ে আমার অন্যতম ফেভারেট খাবার হয় – আর কি, শুটকি। মা আর আগের সেই মা নেই; তার চুল সব পেকে গেছে, চোখের জ্যোতি কমেছে অনেকটাই, চেহারায় বয়সের ছাপ। কিন্তু এখনো চান্স পেলেই সে আমার শুটকি-খাওয়া নিয়ে টিপ্পনি কাটে।


নিচতলার সাত্তার আন্টি ছিলেন খুবই মাইডিয়ার টাইপ একটা মহিলা। আমার মাকে উনি ডাকতেন আমার ডাকনাম ধরে – খাস সিলেটে উচ্চারণে – ‘অভির আম্মা‘।

মাঝেমধ্যে আন্টি আমাকে ঘরে বানানো এটা-ওটা খাওয়ানের চেষ্টা করতেন। উনার নিজের পোলাপানের এসব খাবারে কোন আগ্রহ ছিল না, তাই আমি সাধারণত ভদ্রতা করে সেগুলি ট্রাই করতাম। উনি আহ্লাদে ফেটে পড়তেন।

ব্যাকইয়ার্ডে বাচ্চাদের জন্য একটা ট্রি-হাউজ ছিল। গাছের চাঙ্গে ছোট্ট একটা ঘর, ঢোকার জন্য দরজার সাইজে একটা ফুটা। সাইডে ছোট্ট একটা জানালা। ট্রি-হাউজে উঠার জন্য সেই উদার বৃক্ষের গায়েই খাঁজ করে কাটা সিঁড়ি।

সিঁড়ির প্রথম ধাপটা একটু উঁচুতে হওয়ায় আমার নিজে নিজে উঠা সম্ভব ছিল না। একে তো রিফার সাথে আমার পার্মানেন্ট খারাপ সম্পর্ক, তার উপর ওদের ভাইবোনের গ্রুপিং – প্রতিদিন বিকালে আমি ট্রি-হাউজের দিকে চাতক পাখির মতো তাকিয়ে থাকতাম, আর অনুনয়-বিনয় করে অতীত গুনাহ-খাতার জন্য ক্ষমা-প্রার্থনা করে ট্রি-হাউজে উঠার জন্য সাহায্য চাইতাম।

অন্য ভাইবোনরা, বিশেষ করে বড়গুলি – রত্না, শিবলী, নেহাল – আমার কাকুতি-মিনতিতে গলে যেত। কিন্তু রিফা গলে যাওয়ার পাত্রী না। ট্রি-হাউজের ছাদ ধরে বানরের মতো ঝুলতে ঝুলতে আমাকে নিয়ে সে রীতিমত সালিশ বসাতো। পাঁচ বছর বয়েসে একটা মানুষ ট্রি-হাউজে উঠার জন্য যে কত নিচে নামতে পারে, তার কোন সীমা-পরিসীমা নাই – তাই পুরা ব্যাপারটা রুটিনের মতো হয়ে গিয়েছিল।

প্রথমে রিফা আমার সাম্প্রতিক নানা চারিত্রিক অসংগতি তুলে ধরতো। ফর এক্সাম্পল, কয়েক ঘন্টা আগে আমি তার খেলনা কেড়ে নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিলাম – আমি কি এই ব্যাপারে লজ্জিত কিনা? আমি সঙ্গে সঙ্গে দোষ স্বীকার করে উপরন্ত প্রমিজ করতাম, আমি ভবিষ্যতে কোনদিন এরকম জঘন্য কাজ করবো না। তখন সে নির্মমভাবে আমাকে মনে করিয়ে দিত, গতকালও আমি একই কাজ করেছি। আমি যে শুধরাবো তার গ্যারান্টি কী?

এ পর্যন্ত হলেও সহ্য করা যেত, কিন্তু রিফা এসব আলোচনায় তার ভাইবোনকে জোর করে সাক্ষী হিসাবে ব্যবহার করতো – অপমান আর কাকে বলে! তারপর সে মুচলেকা হিসাবে আমার কাছ থেকে নানা রকম প্রতিশ্রুতি আদায় করতো – যেমন, আমার অমুক খেলনাটা তাকে এক সপ্তাহের জন্য ধার দিতে হবে, অমুক দিন তাকে আমার লেগো সেট দিয়ে খেলতে দিতে হবে, ইত্যাদি। এবং অবশ্যই, অবশ্যই আমার সেই গোরিলা টয়টাকে এখুনি, এই মুহূর্তে বিদায় করতে হবে।

নেগোসিয়েশন করতে করতে আমার কান লাল হয়ে যেত। ফাইনালি, আমাকে নিয়ে কি করা যায় সেই ব্যাপারে রিফা তার ভাইবোনদের মতামত জানতে চাইতো। সাধারণত বাড়ির পোলাপানের সব কথাবার্তা হতো ইংরেজিতে, কিন্তু মতামত আমার ফেভারে গেলে রিফা সঙ্গে সঙ্গে সিলেটি ভাষায় অন্যদের সাথে তীব্র ঝগড়া শুরু করে দিত। ঝগড়া করতে করতেই সন্ধ্যা হয়ে যেত, নয়তো আন্টির ঝাড়ি খেয়ে সবাইকে ট্রি-হাউজ থেকে নেমে আসতে হতো। আমার আর ট্রি-হাউজে উঠা হতো না।

প্রায়ই এসব পরিস্থিতিতে টপটপ করে আমার চোখ দিয়ে গড়িয়ে পানি পড়তো। আমি তখন পকেটের ভেতর গোরিলাটাকে শক্ত করে ধরে থাকতাম, আর কিভাবে কিভাবে রিফার হার্ট অ্যাটাকের ব্যবস্থা করা যায়, মনে মনে সেই প্ল্যান করতাম।

[ চলবে ]


সেই চেনামুখ · ২৪ পর্ব

সব পর্ব

এই লেখককে আরও পড়ুন