পর্ব ০৮
স্মৃতিচারণ · · ৬ মিনিটের পাঠ

আমার জন্য শনিবার হলেও দিনটা আসলে ছিল মঙ্গলবার।
স্কুলে আমি হেসে হেসে আলেকজান্দ্রিয়ার দিকে কয়েকবার তাকালাম। ভেবেছিলাম সন্দেহ করবে, কিন্তু সেরকম কিছু ঘটলো না। ওর এক এশিয়ান বান্ধবী অবশ্য ঠিকই ‘কাহিনী কী’ টাইপ চোখে তাকালো।
ক্লাসে আমি যেচে আলেকজান্দ্রিয়ার পাশে গিয়ে বসলাম, খেলনাপাতি গোছানোর সময় এটা-ওটা এগিয়ে দিলাম। পাশ থেকে রিয়াদ বললো, ‘Do you want to marry her now?’
আমি ফিসফিস করে ওকে প্ল্যানটা বলতে যাবো, এমন সময় দেখি স্বর্ণবেনীময়ী আমার উত্তর শোনার অপেক্ষায় চুপচাপ তাকিয়ে আছে।
ধরা খাওয়ার মতো একটা চেহারা করে বললাম, ‘Yes.’
শুনেই আলেকজান্দ্রার চোখ ঝকঝক করে উঠলো, যেন সে টিভির রিমোট কন্ট্রোল হাতে পেয়েছে।
আমি তাড়াতাড়ি ওকে নিরস্ত করলাম – ‘But not now. In the playground.’
ব্রেক টাইম শুরু হয়।
আলেকজান্দ্রিয়া হাসি হাসি মুখ করে আমার হাত ধরে তার বান্ধবীদের দিকে টেনে নিয়ে যায়।
আমি ফুসলিয়ে ফাসলিয়ে তাকে প্লে-গ্রাউন্ডের একটা তুলনামূলক নির্জন সাইডে নিয়ে আসি।
তারপর কানে কানে ওর চুলের বেনী ধরে ঝুলে টার্জানের মতো ডাকাডাকি করার স্বপ্নটার কথা বলি।
ভেবেছিলাম সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে যাবে, কিন্তু আমার কপালটাই খারাপ – কোনভাবেই রাজি হচ্ছিল না। তখন আমি খুব শান্ত ভাষায় তাকে মনে করিয়ে দিলাম, ফিউচারে আমরা বিয়ে করছি। আমাদের বিয়েতে আকাশ জুড়ে রঙধনু থাকবে, সেই সাথে ইউনিকর্ন। বিয়ের আগেই যদি সে এভাবে আমার মন ভেঙে দেয়, তাহলে কি করে চলবে? আমার এই বিনীত অনুরোধ রাখাটা তার জন্য ফরয।
স্বর্ণকেশী ভাবতে কয়েক সেকেন্ড সময় নেয়। তারপর অনিচ্ছাসত্ত্বে বলে, ‘Okay.’
আমি চকচকে চোখ নিয়ে তার বেনীর দিকে হাত বাড়িয়ে দিই।
তিরিশ সেকেন্ড পরে আমি আবিষ্কার করি, বিকট একটা চিৎকারের পর আমরা দুজনই প্লে-গ্রাউন্ডের মাটিতে। চিৎকারটা এসেছে আলেকজান্দ্রিয়ার লাংস থেকে – আমি টার্জানের মতো ‘অঅঅঅঅ’ করার চান্সই পাই নাই। চুল ধরে ঝোলার সঙ্গে সঙ্গেই চুলওয়ালির সাথে হুড়মুড় করে পড়ে গেছি।
এক্সপেরিমেন্টটায় কাজ হলো না কেন? তার মানে কি ফিজিক্সের সূত্রে গোঁজামিল আছে? কিছুই বলা যায় না, সায়েন্সে সবকিছুই টেস্ট করতে হয়… মাটিতে পড়ে থাকা অবস্থাতেই এসব বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনা শুরু করেছি, এমন সময় ঠাস করে আমার গালে একটা চড়।
তারপর আরেকটা, আরো একটা, অনেকগুলি। কিছু বুঝে উঠতে পারার আগেই আলেকজান্দ্রিয়ার কিল, ঘুষি, চিৎকার, আর লেদারের শু-এর লাথি-বৃষ্টিতে আমি সস্তা পিংপং বলের মতো ট্যাপ খেয়ে গেলাম।
একবার মেরে বালিকার রাগ হজম হলো না – আমি প্লে-গ্রাউন্ড থেকে খোঁড়াতে খোঁড়াতে বাথরুমের দিকে যাচ্ছি, এমন সময় আবার এসে বান্ধবীদের সাথে আমাকে মেরে গেল। এক ঝাঁক মেয়ে চিৎকার-চ্যাঁচামেচি করে একটা ছেলেকে মারছে, স্কুলের সবাই খেলাধুলা ভুলে কিছুক্ষণ সেই প্যাকেজ নাটক চেয়ে চেয়ে দেখলো। দুই ফোঁটা যে চোখের পানি ফেলবো, সেই প্রাইভেসিটুকুও নাই।
ব্রেক শেষে আলেকজান্দ্রিয়া ক্লাসটিচারকে আমার কুকীর্তি অভিনয় করে দেখালো। এমনিতে আমার গুণমুগ্ধ মিস মার্গারেট সব শুনে এমনভাবে আমার দিকে তাকালেন, যেন আমি ভয়াবহ বেকুব একটা ছেলে, বা মার্ডার কেসের আসামি। জীবনে প্রথমবারের মতো আমাকে সাইলেন্ট কর্নারে বসতে হলো – ক্লাসরুমের একপাশে রাখা একটা প্লাস্টিকের চেয়ার, দুষ্টুমি করলে যেখানে একঘরে হয়ে বসে থাকতে হয়।
কি লজ্জা, কি লজ্জা! বারবার আমার চোখে পানি চলে আসছিল। সাইলেন্ট কর্নারে বসে আমি চুপচাপ চোখ মুছলাম, আর ছুটির ঘন্টার অপেক্ষায় একটু একটু করে মরে যেতে থাকলাম।
নারীমহলে বহুল সমাদৃত মহামতি শরৎচন্দ্রের ভাষায় – বড় প্রেম শুধু কাছেই টানে না, দূরেও ঠেলিয়া দেয়। মেয়েদের সাথে আমি আগেও খুব একটা খেলতাম না।
সেই ট্র্যাজিক লাভ স্টোরির পর থেকে আমি তাদের সাথে দশ হাত দূরত্ব রেখে চলা শুরু করলাম। (আলেকজান্দ্রিয়ার বেলায় একশ হাত।)
তাছাড়া আগে থেকেই আমার মনে হতো, মেয়েরা খুব noisy. তাদের কথা বলা, হাসাহাসি, চিৎকার – সবকিছুই উচ্চ ডেসিবেলে, অত্যধিক, বেশি বেশি। উপরন্তু প্লে-গ্রাউন্ডে, স্কুলের করিডরে তারা দল বেঁধে হাঁটে। যেন একঝাঁক সন্ত্রাসী হেঁটে যাচ্ছে।
ভেবে দেখলাম, আমি চুপচাপ, সাদাসিধে, বিজ্ঞানমনস্ক লোক। টার্জান হতে না পারলেও এই জীবনে পিটার পার্কার তো হচ্ছিই। কি দরকার আমার ঝামেলায় জড়ানোর? অতএব, মাতৃস্থানীয় এবং নিতান্তই পূর্ব-পরিচিত, সোনালী ব্যাংক ফ্যামিলি সার্কেলের মেয়েরা ছাড়া বাদবাকি নারীসমাজকে আমি মনে মনে বয়কট করলাম।
এমনও হয়েছে – সত্যি সত্যি – রাস্তার একপাশ দিয়ে আমি হেঁটে যাচ্ছি (প্লে-গ্রাউন্ডের গ্রিল ফসকে বের হওয়া যেত, আমরা প্রায়ই যেতাম), এমন সময় একটা মেয়ে অন্যদিক থেকে এগিয়ে আসছে – তখন আমি রাস্তা ক্রস করে উল্টা দিক দিয়ে হাঁটা দিতাম।
একদিন মা আমাকে নিয়ে একটা বাচ্চাদের কাপড়ের দোকানে ঢুকলো। আমি bored হয়ে এটা-ওটা নাড়াচাড়া করতে করতে হঠাৎ আবিষ্কার করি, আমার গর্ভধারিনী স্বপ্ন-স্বপ্ন চোখ নিয়ে একটা ড্রেস খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে।
মেয়ে বেবিদের ড্রেস।
আমি হা করে তাকিয়ে আছি দেখে সে তাড়াতাড়ি শাক দিয়ে ফিশ ফিংগার্স ঢাকার মতো করে বললো, ‘দেখছ, কি সুন্দর জামাটা!’
আমি শীতল গলায় তাকে স্মরণ করিয়ে দেই, ‘But you’re having a baby boy mummy, remember?’
‘That’s right!’ মা হেসে ড্রেসটা আবার হ্যাঙারে ঝুলিয়ে রাখে।
আমি ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ি।
সময় এগিয়ে যায়।
রিফার সাথে যথারীতি আমার সম্পর্ক খারাপ থাকে। চান্স পেলেই আমি গোরিলা নিয়ে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ি।
ক্লাসে ব্যাঙের প্রজননচক্র শেখানোর জন্য ছোট্ট একটা একুয়েরিয়ামে অসংখ্য ব্যাঙের পোনা রাখা ছিল – বড় হয়ে সেগুলির লেজ থেকে পা হয়, তাদের চেহারাগুলি আরো ব্যাঙ-ব্যাঙ হয়।
স্কুলের লাইব্রেরিতে আমি গল্প, অংক, আর বিজ্ঞানের বইয়ে বুঁদ হয়ে থাকি – বয়স্ক লাইব্রেরিয়ান মহিলাটা প্রায়ই আমাকে জোর করে ক্লাসে ফেরত পাঠায়।
টাইরান নামে ব্ল্যাক একটা ছেলের সাথে বন্ধুত্ব হয় – আমার জীবনের প্রথম অফিশিয়াল বেস্ট ফ্রেন্ড। আমার মতোই ধীর-স্থির, কিন্তু ছোটাছুটি করতেও পছন্দ করে, বিশেষ করে জিম ক্লাসে। এবং নারীবিদ্বেষী।
টাইরানের মা-ও সে সময়ে প্রেগনেন্ট ছিল। ওর তখন টেনশন, যদি একটা বোন হয়?
শুনে আমি বললাম, ‘Didn’t you make your mummy promise not to have a baby girl?’
সে মন খারাপ করে বললো, ‘No, I didn’t think of it.’
‘Well I did. My mommy isn’t having a baby girl. Only baby boys. One baby boy.’
‘But you can’t control these things.’
শুনে আমার ঘাড়ের লোম দাঁড়িয়ে গেল। প্রবলভাবে মাথা নাড়তে নাড়তে আমি বলি – ‘Yes you can! A promise is a promise!’
কিন্তু লন্ডন-জীবনে আমার জন্য আরো বড় অঘটন অপেক্ষা করছিল।
একদিন মা হঠাৎ আমাকে বলে – ‘আব্বু, we are going back to Bangladesh!’
[ চলবে ]