বাংলাপ্রিয়বিভাগ
সেই চেনামুখ · পর্ব ২৩

পর্ব ২৩

লেখার আকার

গ্রামের নাম চৌগাছি

চাক বেঁধেছে মৌমাছি

মধুর চাকে মৌ নেই

পুতুল খেলার বউ নেই।

কবি আবু সালেহ এই ছড়াটা লেখার সময় geographically aware ছিলেন কিনা, আমি জানি না। কাজেই ‘চৌগাছি’ নামটা কি উনার কল্পনাপ্রসূত, নাকি সত্যিকারের চৌগাছি গ্রামকে মিন করে লেখা – সেটা বলা যাচ্ছে না।

আমাদের পৈতৃক নিবাস বাস্তবের চৌগাছি গ্রামে। কালের আবর্তে যা মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলায়। আরেক বিখ্যাত কবি আমাদের গ্রাম নিয়ে একটা অতি বোরিং কবিতা লিখেছিলেন। যতদূর মনে পড়ে, সেটা এককালে পাঠ্যবইতেও ছিল। এত বছর পরও যে আমার কখনো চৌগাছি যাওয়া হয়নি, এবং এই জীবনে হয়তো যাওয়া হবেও না, তার কারণ সম্ভবত সেই নিম্নমানের পদ্য।

গ্রাম জিনিসটা নিয়ে আমার আগ্রহের সূত্রপাত ১৯৮৬’র কোন এক দুপুরে। আমার এক ফুফা মাগুরার আরেক এলাকায় ইংরেজির শিক্ষক ছিলেন। উনি এসে আমার হ্যান্ডশেক করতে করতে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হ্যাল্লো তাশফীন, হাউ আর ইউ?’

আমি সানন্দে বাংলায় বললাম, ভালো আছি। ভেবেছিলাম আমার বিলেত-ফেরত কন্ঠে বাংলা শুনে ফুফা ইমপ্রেস্ড হবেন, কিন্তু উনি ইংরেজিতেই কথাবার্তা চালালেন। এ-কথা, সে-কথা পরে জানতে পারলাম, উনি ঢাকায় থাকেন না। থাকেন ‘ভিলেজে’।

‘What’s a village?’ আমি কৌতূহলী হই।

‘আ ভিলেজ ইজ…’ বলতে বলতে ফুফা বিস্ময়ের চোটে বাংলায় সুইচ করেন। ‘তুমি সত্যি সত্যি ভিলেজ কি তা জানো না?’

আমি মাথা নেড়ে ব্যাপারটা কনফার্ম করি।

পাশ থেকে আমার দাদা বলে, ‘ও জানবে কোথা থেকে? লন্ডনে তো আর গ্রাম নাই।’

‘তা তো বুঝলাম, কিন্তু শহরের বাইরে তো গ্রাম আছে,’ ফুফা যুক্তি দেখান। ‘সেইগুলির কথা তো নিশ্চয়ই ওখানকার স্কুলের বইতে পড়ায়?’

আমি মাথা ঝাঁকিয়ে কনফার্ম করি, পড়ায় না।

দাদা যোগ করে, ‘বিলেতের আশি পার্সেন্ট লোক শহরে থাকে। আশি কি, নব্বই-পঁচানব্বই পার্সেন্টই হয়তো সিটিতে থাকে। ঐখানে আমাদের দেশের মতো না।’

আমার শ্মশ্রুমন্ডিত ফুফা এবার অবাক হয়ে চেয়ারে বসে পড়লেন। ‘কিন্তু ওয়ার্ল্ডের বেশিরভাগ লোকই তো গ্রামে থাকে! তাদের কথা যদি সিলেবাসের কোথাও উল্লেখই না করে, তাইলে এই ছোট ছোট বাচ্চারা পৃথিবী সম্পর্কে কী শিখবে!’

আমি হাসিমুখ কনফার্ম করি – গ্রামীণ পপুলেশন নিয়ে লন্ডনের স্কুলগুলি খুব একটা ভাবিত না।


তথাপি আমার মধ্যে ফুফার বিস্ময় কিছুটা সংক্রমিত হয়। আমি মনে মনে গ্রাম খোঁজা শুরু করি।

বাবাকে বললাম, ‘Daddy, I want to see a village.’

জন্মদাতা অত্যন্ত উৎসাহের সাথে বলে, ‘চলো, কালকেই যাবো!’

আমি নিরাশ হই – তার উৎসাহটা নিছক আমাকে খুশি করার জন্য। ‘কালকেই যাবো’ মানে আপাতত যাওয়া হচ্ছে না। অথচ চাইলেই কিন্তু একটা গ্রামে যাওয়া যায়। ফুফা তাদের গ্রামে যাওয়ার দাওয়াত দিয়ে রেখেছেন। আমাদের নিজের গ্রাম চৌগাছি তো আছেই।

ততদিনে আমি প্রতিদিন সন্ধ্যায় বাবার সাথে বাংলা শিখতে বসি। প্রায়ই তখন কারেন্ট থাকে না। হারিকেনের আলোয় আমাদের বাংলা-চর্চা চলে। সলতে-পোড়া কালো ধোঁয়ার সাথে সাথে আদর্শ লিপির যুক্তাক্ষরগুলি নেচে উঠে। আলো-আঁধারের খুনসুটিতে বাড়ির মানুষগুলিকে অনেক বড়, অনেক চঞ্চল দেখায়। এমন কি আমার ছোট্ট বোনের ছায়াটাও প্রকান্ড মনে হয়।

হারিকেনের কেরোসিনের গন্ধে আমার দম বন্ধ হয়ে আসতে চায়। আমি শিওর, এটা টক্সিক কিছু। বাবা হেসে ব্যাপারটা উড়িয়ে দেয়।

‘আমাদের ছোটবেলায় তো ইলেকট্রিসিটিই ছিল না! কুপি নাইলে হারিকেনই ছিল ভরসা!’

আমি তবু আশ্বস্ত হতে পারি না। ঘ্যানঘ্যান করে মোমবাতি ধরানোর আবদার করি। মোমবাতিতে কেরোসিনের গন্ধ হয় না। তাছাড়া দেখতেও সুন্দর লাগে। বার্থডে বার্থডে একটা ভাব।

একটাই মুশকিল – না, দুইটা মুশকিল আসলে। প্রথমত, মোমবাতিতে হারিকেনের মতো আলো হয় না। আর দ্বিতীয়ত, মোম গলে হাতের উপর পড়লে ব্যথা লাগে। সেই ব্যথার মধ্যে অবশ্য এক ধরনের আসক্তি আছে, বারবার গলন্ত মোম ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে হয়।

নস্টালজিয়ার বেলাতেও কিন্তু তাই – তাই না?


একদিন লক্ষ্য করলাম, একটা অল্পবয়েসী লোক আমাদের বাসার আশেপাশে অনেকক্ষণ ধরে ঘুরঘুর করছে। এগিয়ে গিয়ে বললাম, ‘এই যে ভাই, কাকে খুঁজতেছেন?’

বলেই সঙ্গে সঙ্গে একটু প্রাউড ফিল করলাম – এখন তাহলে আমি বাংলায় কথাবার্তা চালাতে পারি! শুনে লোকটা বললো, ‘এইটা খোকা মল্লিকের বাড়ি না?’

‘না, এখানে এই নামে কেউ থাকে না।’

সে হতাশ হয়। ‘ও! কিন্তু আমারে তো এই ঠিকানাই দিলো!’

‘কে দিলো?’

‘দোলা ভাই।’

‘দুলাভাই?’

‘না দুলাভাই না, দোলা ভাই। আমি চৌগাছি থেকে আসছি।’

চৌগাছি থেকে! আমি তাকে অপেক্ষা করতে বলে দৌড়ে গিয়ে দাদার রুমে গিয়ে দাদাকে জিজ্ঞেস করলাম – ‘Do you know anybody called খোকা মল্লিক? I know, it’s a funny name…’

সে গম্ভীর গলায় বললো, ‘হুম।’

‘Where is he? একটা লোক তাকে খুঁজতেছে।’

‘কোথায়?’ দাদা উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলে।

‘নিচে।’

‘নিয়ে আসো তাকে।’

‘But he’s not here to see you. He’s here to see…’

‘আমিই খোকা মল্লিক।’

আমি হা করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকি।

‘কই গেলা না? বল্লা দাঁড়ায়ে আছে।’

গেলাম। লোকটা ঘন্টাখানেক থেকে নাস্তা খায়, গল্প-টল্প করে। দাদা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তার কাছ থেকে চৌগাছির খবর জোগাড় করে। কোথায় যেন একটা বড় গাছ ছিল, সেটা এখনো আছে কিনা – সেসবও জিজ্ঞেস করে।

লোকটা বিদায় নেয়ার পর আমি দাদাকে ছেঁকে ধরি। ‘Why didn’t you tell me you had a different name? I thought your name was ASM Wahab!’

চৌগাছি-ভুবন থেকে ছিটকে পড়ে পিতামহ বলে, ‘They’re both my name. One is my childhood name. The other is my proper name.’

‘কিন্তু তুমি আমাকে আগে বল্লা না কেন? Why did you keep it a secret?’

‘It’s not a secret. আগের নেইমে কেউ আমাকে আর এখন ডাকে না।’

‘Why?’

‘Why?.... খোকা নামে যারা আমাকে ডাকতো, তাদের বেশিরভাগই আর বেঁচে নাই। That’s why.’

আহারে, বেচারার শৈশবের নামটা extinct হয়ে যাচ্ছে! তার কাঁধে হাত রেখে আশ্বস্ত করলাম, ‘Don’t be sad দাদু! I can call you by that name!’

‘না লাগবে না। Besides,’ বৃদ্ধ সরু চোখে যোগ করে, ‘তুমি তো বল্লা funny name…’

আমি তখন নানা মিষ্টি কথায় শাক দিয়ে ফিশ ফিংগার্স ঢেকে তার মন জয় করার চেষ্টা করি।

[ চলবে ]

সেই চেনামুখ · ২৪ পর্ব

সব পর্ব

এই লেখককে আরও পড়ুন