লিনিয়ার অ্যালজেব্রা
মানুষ ও উপলক্ষ · · ১২ মিনিটের পাঠ

মাথার কোঁকড়া, কাঁচাপাকা চুলগুলি উশকোখুশকো। বাতাস-সওয়া ঘাসের মতো একটা আরেকটার উপর হেলে আছে।
চোখে রিমলেস চশমা, চশমার ফ্রেমের নিচে ওয়াইটবোর্ডের দিকে নিবিষ্ট দৃষ্টি। গায়ে নীল স্ট্রাইপের হাফ-হাতা একটা শার্ট; ধোঁয়ার পর ইস্ত্রি করা হয়নি নিশ্চয়ই। হাতে সস্তা হাতঘড়ি (“যত দামিই হোক, ঘড়ি তো শেষপর্যন্ত সময় দেখার জন্যই!”), আর গৎবাঁধা জিন্সের প্যান্টের নিচে একজোড়া বুট। উনার মনোযোগ অংকে, আর আমাদের মনোযোগ উনাতে।
সময় সকাল আটটার একটু বেশি। হঠাৎ শীত পড়ে যাওয়া সেই শীতকালে আমরা ঠকঠক করে কাঁপছি। কারো পরনে সোয়েটার, কেউ বা বাবার ব্লেজারটাই পরে চলে এসেছে। তাতেও কাজ না হওয়ায় সবাই ডার্লিংয়ের মতো মাফলার বা শালের সাথে জড়াজড়ি করে বসে আছে। অ্যালজেব্রারও তো একটা সীমা-পরিসীমা আছে, নাকি? এই মানুষটার কি একটুও ঠান্ডা লাগে না!
কতক্ষণ যে আমরা অংক-টংক ভুলে স্যারের দিকে হা করে তাকিয়ে ছিলাম, আল্লাহ মালুম। হঠাৎ উনি ব্যাপারটা টের পেয়ে ঘুরে দাঁড়ালেন। “কী?”
আমরা তখনো হতবাক। একজন শুধু বলে উঠলো, “স্যার…!”
ব্যস, ঐটুকুই। কোন ব্যাখ্যাও দিতে হলো না। স্যার হো হো করে হেসে উঠে বললেন, “ও, এই ব্যাপার! আমি সাইবেরিয়াতে ছিলাম তো, আমার আর শীত-ফীত করে না। মাইনাস টেম্পারেচারে থাকতে থাকতে আমি ঠান্ডা-প্রুফ হয়ে গেছি…”
কিছুক্ষণ সাইবেরিয়ার গল্প করে-টরে উনি আবার ফর্মূলার মধ্যে ডুবে গেলেন। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমি x, y, z এর জগতে ফিরি।
বিশ্বাসই হচ্ছে না, সেই মানুষটা আর নাই।
কোর্স লিস্টে টিচারদের নামের ইনিশিয়ালস্ দেয়া থাকতো। নর্থ সাউথের ডঃ পার্থ প্রতিম দে তাই ‘পার্থ স্যার’ না হয়ে আমাদের কাছে সারাজীবনের জন্য হয়ে গেলেন ‘পিপিডি’।
কোভিড তাকে নিতে পারবে না আগেই জানতাম। এই জাতীয় উটকো রোগে পরাস্ত হওয়ার মতো পাবলিক তিনি নন। তার উপর থাকতেন কাঁঠাল বাগানে, মানে আমাদের এলাকায়। সেজন্য একরকম ধরেই নিয়েছিলাম, লোকটা অমর।
ভালোই লম্বা ছিলেন। ছয় ফুটিয়া? নাকি একটু বেশি বা কম?
হাঁটতেন ঝুলে ঝুলে, কিছুটা ইন্ডিয়ান ক্রিকেটার আজহারউদ্দিনের মতো। কথা বলার সময়ও স্যারের কিছু কিছু স্বরবর্ণ ঝুলে যেত। সালামের প্রত্যুত্তরে যেমন সবসময় বলতেন, “ভালো আছোওও?” সেই অতিরিক্ত ‘ও’গুলিতে থাকতো অনেকখানি দরদ, আর একটু হলেও খ্যাপামি।
সেই স্নেহ আর eccentricityর মিশেলে সিরিয়াস টাইপের কোন ছাত্রীকে তিনি সম্বোধন করতেন ‘স্বরস্বতী’ বলে। ক্লাসে অমনোযোগী কোন ছাত্র হয়ে যেত ‘উত্তম কুমার’, ‘অমিতাভ বচ্চন’ বা ‘মিঠুন চক্রবর্তী’। আর দেরিতে কোর্স রেজিস্ট্রেশন করতে আসা কোন স্টুডেন্টের পক্ষে তদবির করতে গিয়ে তাকে উল্লেখ করতেন ‘আপদ’ বা ‘উপদ্রব’ হিসাবে। আমার বেলায় যেমন ডিপার্টমেন্ট হেডকে ফোন করে বলেছিলেন, “হ্যালো স্যার, একটা আপদ এসে উপস্থিত হয়েছে…”
এরকম হাজারো মজার মজার কথায় স্যার আমাদের ভজিয়ে রাখতেন, এবং লাইনে রাখতেন। বরাবরই পিপিডি খুব straightforward টাইপের শিক্ষক ছিলেন। ক্লাসে কেউ মনোযোগী না হলে, বা পড়ালেখায় ঠিকমতো এফোর্ট না দিলে সেই স্টুডেন্টের পচানি খাওয়া ছিল নিশ্চিত।
অনেকক্ষেত্রেই সেই পচানি খাওয়া ছেলেটা ছিলাম আমি নিজে।
সত্যি বলতে কি, কমপিউটার সায়েন্সে পড়ার আমার কোন ইচ্ছাই ছিল না। বাসার প্রেশারে ভর্তি হয়েছিলাম।
কোন কোর্সে ফেল করেছিলাম বলে মনে পড়ে না, কিন্তু বহু কোর্সেই স্রেফ টেনেটুনে পাশ করার জন্য পড়ালেখা করতাম – তাও সাধারণত পরীক্ষার আগের রাতে।
ঝামেলা লেগে গেল পিপিডির কোর্সগুলায়। আমি ফাঁকি দিচ্ছি, এটা উনি কোনভাবেই পছন্দ করতেন না। আমাকে শিক্ষা দেয়ার জন্য ক্লাসে কঠিন কঠিন সব প্রশ্ন করতেন। মাঝেমধ্যে উনার অফিস আওয়ার্সে দেখা করতে বাধ্য করতেন, অংক বুঝিয়ে দেবেন বলে। তার উপর যখন আবিষ্কার করলেন আমরা প্রায় প্রতিবেশী (আমাদের বাসা উনার বাসা থেকে মাত্র দুই-তিন মিনিট দূরে), তখন স্যারের হাবে-ভাবে এক ধরনের অধিকারবোধও চলে আসলো। যেন পাড়ার লোক হিসাবে আমাকে অংকে ভালো হতেই হবে।
তাতে অবশ্য আমার মধ্যে খুব একটা পরিবর্তন আসলো না। আমি যেরকম ফাঁকিবাজ, সেরকম ফাঁকিবাজই থেকে গেলাম। ক্লাস টেস্টে বা অ্যাসাইনমেন্টে মার্কস খুব খারাপ করলে উনার বাসায় গিয়ে অংক শিখে আসতে হতো, এই যা। সেটাও অবশ্য পালিয়ে পালিয়ে থাকলে এড়ানো যেত। আমি সাধারণত পালিয়েই থাকতাম।
একদিন ক্লাস-টাস শেষ করে বাসায় যাব – সাথে গাড়ি ছিল না। সিএনজি খুঁজতে গিয়েই দেখি স্যার সিএনজি ঠিক করছেন। আমি গা ঢাকা দিতে যাবো, এমন সময় পিপিডি হাঁক দিলেন – “অ্যাই তাশফীন, কই যাচ্ছ?”
আমি আমতা আমতা করে বললাম, “স্যার বাসায়।”
“চলো একসাথে যাই, তোমার আর আমার বাড়ি তো একই জায়গায়।”
সিএনজিতে উঠে পড়লাম। কিছুদূর যাওয়ার পরই স্যার বললেন, “তোমাকে ইদানিং ক্যাম্পাসে দেখি না যে?”
বলতে তো আর পারি না যে উনাকে দেখলেই আমি কেটে পড়ি! তাই বললাম, “না স্যার এমনি…”
“আমি তোমাকে ম্যাথে ভালো করার জন্য পুশ করি দেখে আবার কিছু মনে করো নি তোওও?”
“জ্বি না স্যার!”
“হুম, আমি ঠিকই বুঝেছি।”
আমি চুপ। স্যার কিছুক্ষণ আমায় কেন পুশ করেন, আমার ভেতরে অংক জিনিসটা ঠিকই আছে, ম্যাথ জানা থাকলে যে বিদেশে পড়তে গেলেও লাইফ কত সহজ হয়ে যায় – এসব বললেন-টললেন। আমি জ্বি স্যার, অবশ্যই, হু-হা করে শর্টকাটে কাজ সারলাম।
কথোপকথন চালিয়ে যাওয়ার আশায় পিপিডি তবু একটু পরে জিজ্ঞেস করলেন, “আচ্ছা, তোমার লাস্ট ক্লাসটা কী ছিল?”
এতদিন পর আর কোর্স নাম্বারটা মনে নাই, 400-লেভেলের একটা ইংলিশ কোর্স ছিল। শুনে উনি অবাক হয়ে জানতে চাইলেন আমি এই কোর্স কেন করছি। বললাম, ইংলিশে ডাবল মেজর করছি…
ব্যস, স্যার কেমন যেন গলে গেলেন। সাহিত্য জিনিসটা যে তার খুব পছন্দের, সেটা আগেই জানতাম – উনার ক্লাসে প্রায়ই পাস্তার্নাক, শেক্সপিয়র, রবীন্দ্রনাথ, দস্তয়েভস্কি, সলঝেনিৎসিনদের কথা বলতেন – কিন্তু লিটারেচার জিনিসটা যে এতটা পছন্দ করতেন, আগে কখনো বুঝিনি।
স্যারের সাথে শেষ যেবার দেখা হয়েছিল, উনাকে একটা বই দিয়েছিলাম। Gregory David Roberts এর লেখা Shantaram উপন্যাস। কি যে খুশি হয়েছিলেন! আধা ঘন্টা মতো ছিলাম তার অফিসে। ঐটুকু সময়ের মধ্যে যে-ই তার রুমে এসেছিল, সবাইকে স্যার বলেছিলেন – “এই দেখেন, আমার ছাত্র আমার জন্য কানাডা থেকে বই নিয়ে এসেছে!”
স্যারের সাথে শেষ ইমেইলটাতেও সাহিত্য নিয়ে কথা হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে।
আমাকে যারাই ভালো করে চিনে, তারা জানে আমি ভেতরে ভেতরে খুব গাধা টাইপের। তার উপরে ইমোশনাল হয়ে গেলে তো কথাই নাই, আমার মুখ দিয়ে পলিটিকালি ইনকারেক্ট কিছু একটা বের হয়ে যাবে।
একদিন সেই গাধামির রেশ ধরে ঠাস করে পিপিডিকে বলে ফেললাম – “স্যার আমার কমপিউটার সায়েন্স ডিপার্টমেন্টের কোন কোর্স করতেই ভালো লাগে না!”
বলেই মনে হলো, হায় হায়, এইটা কি করলাম? ঐ কোর্সগুলির মধ্যে অনেকগুলিই তো স্যারের কোর্স! দরকারের সময় র্যাটম পাওয়া যায় না কেন?
কিন্তু মাইন্ড করা তো দূরে থাক, পিপিডি উল্টা আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে-টিয়ে একাকার। শুধু তাই না, আমাকে নিয়ে হিসাবে বসে গেলেন, কমপিউটার সায়েন্সের কোন্ কোর্সে কি রকম এফোর্ট দিতে হবে, যাতে মোটামুটি সম্মানের সাথে গ্র্যাজুয়েট হওয়া যায়। বিশদ আলোচনা সেরে-টেরে স্যার জিজ্ঞেস করলেন, “ভালো কথা, তোমার ইংলিশের কোর্সগুলিতে সিজিপিএ কত?”
আমি সিজিপিএ বললাম। শুনে উনি আরেক দফা গলে গেলেন, এবং আমার মাথায় হাত বুলিয়ে আশীর্বাদ করে-টরে বললেন: “তো যেই ছেলে ইংলিশে এরকম রেজাল্ট করতে পারে, সে MAT-240তে আরেকটু ভালো তো চাইলেই করতে পারে…”
তারপর থেকে উনার ক্লাসে কখনো পড়া না পারলেই আমাকে পচাতেন, “ও ইংলিশ ডিপার্টমেন্টের ছাত্র তো, তাই আর অংক ভালো লাগছে না!”
বলা বাহুল্য, উনি সবসময় স্টুডেন্টদের কাছ থেকে সেরাটা আদায় করার চেষ্টা করতেন।
এতদূর পড়ে হয়তো আপনি ভাবছেন, ও আচ্ছা, এটা একটা আন্ডারডগ স্টোরি। পিপিডি স্যারের জাদুতে আমি কিভাবে ম্যাথের বিদ্যাসাগর হয়ে গেলাম, এটা ঐ টাইপের কোন গল্প।
না, ঐরকম কিছু ঘটে নাই; আমি ম্যাথে আগেও লবডংকা ছিলাম, এখনো তাই।
সত্যি বলতে কি, স্যারের ক্লাসগুলি আমার কাছে একটু দুর্বোধ্য লাগতো। ধরে নিচ্ছি ছাত্র হিসাবে এটা আমারই ব্যর্থতা। স্যারের মেধা-বন্দনার যোগ্যতা আমার নাই; পিপিডির গোটা চল্লিশেক রিসার্চ পেপার আছে, উনি ফুল প্রফেসার ছিলেন, ডিপার্টমেন্ট হেড ছিলেন, ACMএর কোচ ছিলেন, দেশে-বিদেশ তার অসংখ্য কৃতি ছাত্র-ছাত্রী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে – এসবেই হয়তো তার অমরত্ব, বা অমরত্বে তার যতটুকু অংশীদারিত্ব, তা।
একজন বিখ্যাত ব্যবসায়ী বা গায়কের পাশে একজন পিপিডিকে বাংলাদেশ ঠিক কতটুকু মূল্যায়ন করবে, বা করা উচিৎ? সেটাও আমি সমাজবিজ্ঞানীদের হাতে ছেড়ে দিচ্ছি।
আমার আগ্রহ বরং মানুষ-পিপিডিতে, অনেকটা একটা ফিকশনাল ক্যারেক্টার নেড়ে-চেড়ে দেখার মতো করে। কেন? কারণ আমার ধারণা, তাকে আগামী বিশ-ত্রিশ বছরেই তার কাছের মানুষজন বাদে সবাই ভুলে যাবে। কিন্তু লোকটার প্রবল আত্মসম্মানবোধ ছিল, হার না মানার প্রত্যয় ছিল, এবং সর্বোপরি স্টুডেন্টদের প্রতি একধরনের মানবিক দায়িত্ববোধ ছিল – যেই কম্বিনেশনটা আজকাল বলতে গেলে আর দেখাই যায় না। সেটা সেলেব্রেট করা দরকার। সমাজের স্বার্থে না হলেও, আমার নিজের স্বার্থেই।
বিস্মিত হওয়ার জন্যই বোধহয় বেঁচে থাকা। ইদানিং প্রায়ই বিস্ময় নিয়ে লক্ষ্য করি, আগের অনেক সম্পর্কই কেমন যেন অটোমেটিক সারাংশ হয়ে যাচ্ছে। একসময় যাদের সাথে ফুটবল না খেললে, ঘন্টার পর ঘন্টা আড্ডা না দিলে মনে হতো লাইফটা বোরিং, এখন তাদের কারো কথা ভাবলে বড়জোর মনে হয়, অমুক ছেলেটা। যে মেয়েটার সাথে আর্ট গ্যালারিতে ঘুরে ঘুরে ছবি দেখতাম, তার সাথে ফেইসবুকেও আর কথা হয় না; পরিচয় সংকুচিত হতে হতে সে গেছে ঐ যে, ঐ মেয়েটা।
আমি চাই না পিপিডি স্যারের বেলাতেও আমার এরকম হোক। কোন কিছু লিখে ফেললে একটা ম্যাজিকের মতো জিনিস হয় – যাকে নিয়ে লেখা, তাকে ভুলে যাওয়াটা একটু কঠিন হয়ে যায়। আমি সেই আশায় লিখছি।
জ্বীনরা নাকি যে কোন প্রাণীর রূপ ধারণ করতে পারে, এবং তাদের পায়ের পাতা থাকে পিছন দিকে। গতকাল বাসায় ফিরতে ফিরতে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটলো। হঠাৎ মনে হলো, গাড়িতে আমার জায়গায় স্যার বসে আছেন। তিনি গুনগুন করে গান গাইছেন আর জানালার বাইরের দৃশ্য দেখছেন, অনেকদিন আগে তাকে যেরকম গুনগুন করে ‘পাকিজা’ ছবির গান গাইতে শুনেছিলাম।
কে জানে, হয়তো আমি জ্বীন হয়ে যাচ্ছি।
এত বছর পর যখন ভাবি, পিপিডির কাছ থেকে আসলে আমি কি শিখেছি? তখন সরাসরি কোন উত্তর খুঁজে পাই না।
অংকটা তো শিখতে পারিই নি। তাহলে কি শিখলাম?
তখন হিতোপদেশ স্টাইলে তার বিভিন্ন সংলাপ মনে পড়ে। হঠাৎ হঠাৎ প্রায় অপ্রাসাঙ্গিকভাবে স্যার অদ্ভুত অদ্ভুত সব কথা বলতেন। ওয়াইটবোর্ডে অংক করতে করতে যেমন বলেছিলেন, “Beauty is truth, and truth is beauty. যা সত্য ও সুন্দর, তা শিল্প হবেই। দেখি তো, এই অংকটাকে সুন্দর করতে পারি কিনা…”
বলে উনি এমনভাবে ভ্যারিয়েবলগুলির দিকে তাকিয়েছিলেন, যেন যে-কোন কিছু ঘটতে পারে। অথচ ঐ একই প্রবলেম নিশ্চয়ই উনি কয়েক হাজার বার সলভ্ করেছেন – কেন বলতেন অমন কথা? তারপর একদিন আমি ল্যাপটপে লিখতে লিখতে নিজের প্রতিফলন দেখলাম। সেই প্রতিফলনে আমিও স্যারের মতো দৃষ্টি মেলে একটা প্যারাগ্রাফের দিকে তাকিয়ে আছি। (তাহলে কি অংকও একটা ফিকশন, নাকি ফিকশন একধরনের অংক?)
আরেকদিন স্যার বলেছিলেন, “এমনিতে হিন্দু-মুসলমানরা খালি নিজেদের মধ্যে মারামারি কাটাকাটি করে, কিন্তু স্বার্থে টান পড়লে সব একাট্টা।” কথাটা ঠিক কোন কনটেক্সটে বলেছিলেন, বা আদৌ কোন কনটেক্সট ছিল কেন, মনে পড়ে না। তবে কথাটা শুনে তখন ভেবেছিলাম: এই কথা উনি কেন বলছেন?
ততদিনে স্যারের বাসায় আমি মাঝেমধ্যে উপস্থিত হই। একদিন যাওয়ার পর বৌদি নাশতায় চায়ের সাথে মিষ্টি দিলেন। স্যার অ্যালজেব্রা-আলাপনে বুঁদ। মিষ্টির বাটিটা দেখে হঠাৎ বৌদিকে বললেন, “অ্যাই এটা পূজার মিষ্টি না?”বৌদি কনফার্ম করলেন, হ্যা এটাই সেই মিষ্টি।
“তাহলে ওকে দিও না, অন্য কিছু দাও।”আমি, বৌদি দুজনই অবাক। “কেন?”
“ও তো মুসলিম।”আমি স্যারকে আশ্বস্ত করলাম, আমার মিষ্টি খেতে অসুবিধা নেই। কিন্তু উনি কিছুতেই রাজি হলেন না।
বললেন, “তোমার বাবু শুনলে মাইন্ড করতে পারে। তখন আমি তাকে কিভাবে মুখ দেখাব?”
আমি বললাম, “স্যার আমার বাবা ঐরকম না।”তবু উনি রাজি হলেন না, বৌদিকে বললেন অন্যকিছু দিতে।
আমার ধারণা, স্যার জীবনে কম রেইসিজমের শিকার হননি। তাই সেইদিন মিষ্টি নিয়ে রিস্ক নেননি। আর রেইসিজম জিনিসটা যে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ-বিচিত্র কত টাইপের যে হতে পারে, বিদেশের মাটিতে মাইনরিটি হিসাবে সেটা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি।
একদিন শুনলাম, স্যারের মেয়ে হয়েছে। মেয়ে দেখতে উনার বাসায় হাজির হলাম।
কুশল বিনিয়ময় করে-টরে স্যার একটু পর পাশের ঘর থেকে তার মেয়েকে নিয়ে আসলেন। তারপর উঁচু করে তাকে ধরে বললেন, “এই যে দেখ তোমার বোনকে!”
আমি অবাক হয়ে দেখলাম, স্যার যেন তার কলিজা বের করে আমাকে দেখাচ্ছেন।
আমার নিজের এখন তিন বছরের একটা মেয়ে আছে। নিজেকে চমকে দিয়ে প্রায়ই তাকে ডাকি, “আমার কলিজাটা কই, আমার কলিজা?”
স্যারের কলিজাটা যেদিন আর ঘুম থেকে উঠলো না, সেদিন যে উনার হৃৎপিন্ডও জীবনের সাথে আড়ি নিয়ে ফেললো – তাতে আর আশ্চর্য কি? নিউজটায় তো গুরুগম্ভীরভাবে সেই কথাই লেখা ছিল, তাই না?
মেয়ের মৃত্যুর ধকল সইতে না পেরে স্যার একই দিনে হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যুবরণ করেন।
জন্ম থেকে, না জন্মেরও আগে থেকে হৃৎপিন্ড নামের অঙ্গটার একটাই কাজ – স্রেফ ধুকধুক করে যাওয়া। অথচ সেই ধুকপুকানির মধ্যেই কত সুখ, কত কষ্ট, কত চড়াই-উৎরাই, কত অংক! সারাংশ করলেও আর কতই বা সারাংশ করা যায়?
তাই আমি স্যারের প্রিয় লেখক বরিস পাস্তার্নাকের দ্বারস্থ হচ্ছি। পাস্তার্নাককে বেশিরভাগ লোক চেনে Dr Zhivago উপন্যাসের লেখক হিসাবে। কিন্তু রাশিয়ায় পাস্তার্নাকের প্রধান পরিচয় তিনি একজন কবি।
তার যে কবিতাটা নিচে দিচ্ছে, তার নাম Hamlet – শেক্সপিয়রের সেই কালজয়ী চরিত্রের নামানুসারে। ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন পাস্তার্নাকের ভাগ্নী অ্যান পাস্তার্নাক স্লেটার।
The murmurs ebb; onto the stage I enter.I am trying, standing in the door,To discover in the distant echoesWhat the coming years may hold in store.
The nocturnal darkness with a thousandBinoculars is focused onto me.Take away this cup, O Abba, Father,Everything is possible to thee.
I am fond of this thy stubborn project,And to play my part I am content.But another drama is in progress,And, this once, O let me be exempt.
But the plan of action is determined,And the end irrevocably sealed.I am alone; all round me drowns in falsehood:Life is not a walk across a field.
ইচ্ছে ছিল দেশে গেলে পাস্তার্নাকের কবিতার বই স্যারকে দিয়ে আসবো।
সেটা আর হলো না – Life is not a walk across a field.