স্টেশনমাস্টারকে
মানুষ ও উপলক্ষ · · ৫ মিনিটের পাঠ
কোন এক বাবা দিবসে আমি আমার বাবাকে বললাম – হ্যাপি ফাদার্স ডে!
শুনে বাবা গম্ভীর মুখে বললো, এইগুলা পত্রিকাঅলাদের ফাউ বানানো। কয়েক বছর আগেও এইসব ডে-ফে ছিল না।
আমি বললাম, ঠিকই তো!
পরের বছরের বাবা দিবসে মা বললো – অ্যাই তুমি বাবাকে এখনো হ্যাপি ফাদার্স ডে বলো নাই কেন? ও অপেক্ষায় আছে।
আমি বললাম - বাবা তো এইসব পছন্দ করে না। আর আমার জন্য তো সব ডেই ফাদার্স ডে। কী বলো, বাবা?
বাবা শুনে বললো, হুম।
তার পরের বছর। এবার বাবা নিজেই জিজ্ঞেস করলো – কিরে তুই আমাকে উইশ করবি না?
আমি বললাম ধুর, আমার জন্য তো প্রতিদিনই ফাদার্স ডে। নাকি তুমি সে-কথা বিশ্বাস করো না?
বাবা শুকনা গলায় বললো – না না, তা তো অবশ্যই।
পরের বছর। ফাদার্স ডে’র আগের দিনে বাবা আমাকে অস্থির হয়ে ফোন করে বললো – অ্যাই এই বছর কিন্তু আমাকে উইশ করবি, আমি নাইলে সমাজে মুখ দেখাতে পারবো না।
আমি সরল বিশ্বাসে জিজ্ঞেস করলাম, সমাজ কি ফাদার্স ডে’র উইশ চেক করতেছে?
মাইর খাবি, উইশ করতে বলছি উইশ করবি।
কিন্তু আমার জন্য তো প্রতিদিনই...
ঐসব বুঝি না।
আচ্ছা হ্যাপি ফাদার্স ডে।
আহা আজকে না, কালকে বলতে হবে।
আচ্ছা ঠিক আছে বলবো।
শুনে বাবা খুব খুশি।
ভালোই লাগে আমাদের বাপ-ছেলের এসব খেলা। ছোটবেলায় আমরা দুই ভাইবোন ছিলাম বাবার অন্ধভক্ত। বাবাও আমাদেরকে ছাড়া কিচ্ছু বুঝতো না। মা প্রায়ই বলতো – আমার বাচ্চাদের আসলে দুইজন মা! (Tina Shahrin Khan, সেই লজিকে তোমার দুইজন শ্বাশুড়ি
)
আমার মৌলিক সব স্কিলই বাবার কাছে শেখা। যেমন – হাগু করে ছুঁচু করা, ক্রিকেট খেলা, গাছে উঠা, সাঁতার কাটা, ব্যায়াম করা, মেডিটেশন, ছবি আঁকা, নামাজ পড়া, অ্যালজেব্রা... বলে আসলে শেষ করা যাবে না। প্রত্যেক ছেলেরই তার বাবার সাথে একটা অলিখিত কম্পিটিশন থাকে। সমস্যা হচ্ছে, আমার বাবার স্কিলসেট এতই বিস্তৃত যে শুরু থেকেই আমার কোন চান্স ছিল না। আলেক্সান্ডার দ্য গ্রেট নাকি কিশোর বয়সে কান্নাকাটি করে বলতেন – আমার বাবাই তো সব রাজ্য জয় করে ফেলছে, আমার জয় করার কিছু থাকছে না! আর আমি মোটামুটি জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই ভাবা শুরু করি - আমার বাবাই তো সব পারে, আমার এত পারার দরকারটা কী!
বলা বাহুল্য, বাবাকে আমি সেই বয়সে খুব একটা বুঝতাম না। (আমার ধারণা আমি যে তাকে বুঝি না, সেটা বাবাও বুঝতো না।) কখনো যে বাবার ছায়া থেকে বের হতে পারবো ঘুনাক্ষরেও ভাবিনি। তারপর একদিন ঠাস করে বের হয়ে গেলাম। শিশু হাসপাতালের করিডরে দাঁড়িয়ে দেখলাম, যাকে আগে কখনো কাঁদতে দেখিনি, সেই বাবা হাউমাউ করে কাঁদছে আর বলছে – নাই, নাই!
অর্থাৎ আমার বোনটা আর বেঁচে নাই; মাত্র ছত্রিশ ঘন্টায় কোন মেডিকেল ব্যাখ্যা ছাড়াই সে না-ফেরার দেশে চলে গেছে। চারদিকে সবাই কাঁদছে, আর আমি তখন কেন যেন খালি ভাবছি – আচ্ছা, সবার কান্নায় এত শব্দ হচ্ছে কেন? মনে হচ্ছে অসংখ্য কাঁচের জিনিস পড়ে ভেঙে যাচ্ছে। পরে বুঝেছি ঐটা ছিল হাসি ভাঙার শব্দ। আমার বাবা-মা কেউই সেই দিনটার পর থেকে পুরাপুরি মন খুলে হাসতে পারে না। পৃথিবীর সবচেয়ে মজার জোকস্ শুনেও তাদের হাস্যোজ্জ্বল চোখের কোটর থেকে একটা অপূর্ণতা উঁকি দেয়। কারণ ওদের হাসি ভেঙে গেছে।
শিশু হাসপাতালের করিডরে দাঁড়িয়ে আমি দেখলাম, আমার বাবাও একটা মানুষ... সে মোটর সাইকেল চালাতে পারে, জুডো জানে, জিম্নাস্টিক্স পারে, এক টানে ম্যাপ আঁকতে পারে, জাল ফেলে অনায়াসে মাছ ধরে, খুব ভালো হাত দেখতে পারে, তার উপর সে শৌখিন আর্কিটেক্ট, আবার সে ইলেকট্রনিক্সের জিনিস হুট করে খুলে সেরেও ফেলে... কিন্তু আর দশটা মানুষের মতোই সে সন্তান হারানোর শোক সামলাতে পারে না।
আমার বয়স বাড়ার সাথে সাথে বাবার সেই মানুষ-ভাব আরো তীব্র হচ্ছে। ছোটবেলার অনেক স্মৃতিই ঘাটতে গিয়ে মনে হয় – আরে, ঐসময় তো বাবার বয়স আমার এখনকার বয়সের চেয়ে কম ছিল! তখন স্মৃতিগুলোর অর্থ অন্যরকম হয়ে যায়; নিজের অজান্তেই আমি বাবা নামক চরিত্রটাকে অন্যভাবে বিশ্লেষণ করি। কখনো কখনো মনে হয়, বাবা অমুক কাজটা ঐভাবে না করে এভাবে করলে ভালো হতো। বা বাবার জায়গায় আমি থাকলে নিশ্চয়ই ঐ কথাটা বলতাম না। বা তখন তো বাবার বয়স এখনকার আমার চেয়ে বেশি ছিল, কেন সে তখন এইরকম না করে ঐরকম করতে গেল? ইত্যাদি।
প্রায়ই আমার চিন্তার ট্রেন ছুটতে ছুটতে হাইপোথিসিস নামের একটা স্টেশনে গিয়ে আটকে যায়। আমি অনন্তকাল স্টেশনমাস্টারের অপেক্ষায় বসে থাকি। অবশেষে স্টেশনমাস্টারের পোশাক পরে যেই লোকটা এসে ইঞ্জিন স্টার্ট করে দিয়ে যায়, সে দেখতে অবিকল আমার বাবার মতো। কখনো কিশোর বাবা, কখনো যুবক বাবা। কখনো অশীতিপর বাবা। কিন্তু সবসময়ই সে বাবা।
স্টেশনমাস্টারটা এসে বলে - হোয়াটস রং?
আমি বলি, বুঝতে পারছি না। ট্রেন স্টার্ট হচ্ছে না।
সে তখন ইঞ্জিন ঠিক করতে করতে বলে - হোলো না, তোমার বলতে হবে ‘রং’ জিনিসটা কী?
আমি কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলি, রং মানে তো ভুল, তাই না?
উহু, রং হচ্ছে রয়ে অনুস্বার রং, মানে বর্ণ। কালার। পৃথিবীতে অসংখ্য অসংখ্য রং!
ও আচ্ছা।
ততক্ষণে ট্রেন ঠিক হয়ে গেছে। স্টেশনমাস্টার টুপি ঝাঁকিয়ে লাফ দিয়ে নেমে যায়।
চলন্ত ট্রেন থেকে হাত নাড়তে নাড়তে আমি চিৎকার করি - স্যরি তোমার প্রশ্নের ভুল উত্তর দেয়ার জন্য!
সে তখন ট্রেনের পেছন পেছন দৌড়াতে দৌড়াতে বলে - নো প্রবলেম! মানুষ মাত্রেরই রং হয়।