বাংলাপ্রিয়বিভাগ
মানুষ ও উপলক্ষ

সহায়তা চক্র

লেখার আকার

আমার বাবার টাকা-পয়সার সেন্স খুবই ভালো। একটা উদাহরণ দিচ্ছি।

বাসার টিভিটা পুরানো হয়ে গেছে, মানে এত পুরানো যে সেটাকে খুব সম্ভবত কাগজঅলার কাছে ১০-১৫ টাকায় বিক্রি করতে হবে। আমি আর মা মিলে আলটিমেটাম দিলাম, এবার একটা নতুন টেলিভিশন কিনতেই হবে। বাবা কিছুক্ষণ গাঁইগুই করে শেষে রাজি হয়ে গেল।

সপ্তাখানেক পর বাবা আমাকে খুশি-খুশি গলায় বললো – বাবা, নতুন টিভি নিয়ে আসলাম!

আমি স্কাইপের অন্যপ্রান্ত থেকে হাফ ছেড়ে বলি – যাক, অবশেষে!

বেশি বড় কিনলাম না, পরের বার বড় দেখে কিনবো।

আর পরের বার!

ভালোই হইছে টিভিটা।

কি টিভি কিনলা, কত নিল?

বাবা ডিটেইলস বলে-টলে শেষে যোগ করলো – ও আচ্ছা, পুরা টাকা কিন্তু দিচ্ছি না। কিস্তিতে দিবো।

আমি তো হতভম্ব। পিচ্চি একটা টিভি, সেটাও কিস্তিতে কিনতে হবে? তখন বাবা খুব উৎসাহের সাথে আমাকে বোঝালো যে –

টিভির পুরো টাকাটা ব্যাংকে রেখে...

সেখান থেকে মাসে মাসে কিস্তির টাকা দিলে...

এবং কোন কিস্তি মিস না করলে...

তিন বছরে লাভ ১৫০০ টাকা।

আমার নিজের টাকা-পয়সার সেন্স যেহেতু খুবই খারাপ, শুনে আমি গম্ভীরভাবে বললাম – হুম।

খুব সাদামাটা উদাহরণ হয়ে গেল? আচ্ছা, আরেকটা দিচ্ছি।

অনেক বছর আগের কথা। একটা ব্যাংক – খুব সম্ভবত জনতা বা অগ্রণী – অল্প কিছুদিনের জন্য একটা স্পেশাল একাউন্ট চালু করলো যার ইন্টারেস্ট রেট খুবই হাই – সাধারণ একটা সেভিংস একাউন্টের প্রায় দ্বিগুণ। দেশের প্রধান প্রধান পত্রপত্রিকায় সেই একাউন্টের বিশাল বিশাল বিজ্ঞাপন ছাপা হলো।

মতিঝিল অফিসপাড়ায় চাপা চাঞ্চল্য – একটা সরকারি ব্যাংক এত বেশি ইন্টারেস্ট রেট দিচ্ছে কীভাবে? এত বড় অ্যাড দিলো কেন? দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছে নাকি? কাহিনী কী?

আজকের অর্থনীতি টাইপ কিছু পত্রিকায় ফলাও করে সেই স্পেশাল একাউন্টের রিভিউ ছাপা হলো, যার কনক্লুশন হচ্ছে – ভাই, দৌড় দেন। দৌড়ে গিয়ে ঐ ব্যাংকে একাউন্টটা খোলেন। কাহিনী যাই হোক, বেশিদিন এই অফার থাকবে না।

বলে রাখা ভালো, আমার বাবার ক্যারিয়ারের পুরা সময়টাই কেটেছে সোনালি ব্যাংকে। ফ্যামিলিতে আরো ব্যাংকার আছে; বাবার এবং তাদের সূত্রে আমাদের পরিচিত অনেকেই ব্যাংকে চাকরি করেছেন বা করছেন। যেদিনের কথা বলছি, সেইদিনও আমাদের বাসায় তিনজন ব্যাংকার – বাবা, আমার বড় মামা, আর বাবার এক বন্ধু ফিরোজ আংকেল।

(মামা, চা খেতে খেতে) মাহমুদ ভাই, অমুক ব্যাংকের অফারটা দেখছেন? বাকি সব ব্যাংক তো মাথা চুলকানো আরম্ভ করছে।

(ফিরোজ আংকেল) হা মাহমুদ, দেখছ ঐটা? এত রেট কিভাবে দিতেছে আল্লাই জানে।

(বাবা, খেলার খবরে বুঁদ হয়ে) অ্যা, কি একাউন্ট? কোথায়, জানি না তো।

(মামা) ফার্স্ট পেজেই অ্যাড আছে, দেখেন।

বাবা খুব মনোযোগ দিয়ে বিজ্ঞাপনটা পড়ে বললো – উহু, নিশ্চয়ই কোন ফাঁকিবাজি আছে।

(মামা, হতভম্ব গলায়) কি বলেন, কোন ফাঁকিবাজি নাই। আপনি মনোযোগ দিয়ে অ্যাডটা আবার পড়ে দেখেন।

(ফিরোজ আংকেল) হা মাহমুদ, ফ্রড করলে তো এত বড় বিজ্ঞাপন দেয়ার সাহস পাইতো না।

(বাবা) ফ্রড না, দেখাচ্ছে এক রেট কিন্তু হিসাব করলে অন্য রেট আসবে। মার্কেটিং-এর ফাঁকিবাজি আরকি।

(মামা) কই না, এরকম তো মনে হলো না।

(ফিরোজ আংকেল) ফাঁকিবাজি হলে তো নেটওয়ার্কের কারো না কারো কাছ থেকে শুনতাম...

(বাবা) অ্যাই তাশফীন, একটা কলম নিয়ে আসো তো…

এখনো মনে আছে, কলমটা ছিল নীল রঙের একটা ইকোনো বলপেন। বাবা নিউজপ্রিন্টের উপর চটজলদি কিছু যোগ-বিয়োগ করে দেখালো যে –

অভাবনীয় ইন্টারেস্ট রেটটা যেহেতু শুধুমাত্র একটা নির্দিষ্ট ব্যালেন্স পর্যন্ত প্রযোজ্য…

এবং ন্যুনতম একটা ডিপোজিটের কথা বলা আছে...

কাজেই সেই ব্যালেন্সটা রাফলি চৌদ্দ মাসের মধ্যেই উঠে আসবে…

এবং তারপর যেহেতু নরমাল একটা সেভিংস একাউন্টের মতো ইন্টারেস্ট হবে…

ইত্যাদি…

ইত্যাদি…

অতএব, স্পেশাল একাউন্টটা আসলে খুবই নর্মাল একটা ফিক্সড ডিপোজিট স্কিম। পুরাটাই বিজ্ঞাপনের ভেল্কি; বাজারের আর দশটা মোটামুটি গোছের এফ.ডি.আর.-এর সাথে সেটার তেমন কোন পার্থক্য নেই।

এই পুরো কাহিনী উদঘাটন করতে আমার বাবার সময় লেগেছিল কত জানেন?

মাত্র সাত মিনিট।

চাইলেই হয়তো এরকম একটা মানুষ বড়লোক হতে পারতো। কিন্তু চাকরি করে ধনী হওয়াটা বেশ কঠিন, আর ব্যবসায় তার আজন্ম অনাগ্রহ। নিজের অর্থ-প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে অধ্যপনাও করা যেত; পত্রিকায় কলাম লিখে, প্রাইভেট ভার্সিটিতে পড়িয়ে হয়তো নিজের সেভিংস একাউন্টটা আরেকটু ভারি হতো। কিন্তু বাবা ঠিক সেরকম টাইপেরও না।

তাই ঢাকা শহরের অন্যান্য সৎ, অরাজনৈতিক ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন সরকারি কর্মকর্তাদের বাসার যে হাল ছিল, আমাদের বাসারও সেই হাল ছিল। মানে সারা মাস চিপে চলা, কালে-ভদ্রে রেস্টুরেন্টে খাওয়া, কারেন্ট-গ্যাস-যাতায়াতের খরচ কমানোর জন্য সারাক্ষণ তটস্থ থাকা; এবং এতকিছুর পরও মাসের শেষে কান্নাকাটি অবস্থা।

আমার বাবার মতো মানুষদের জীবনে একবারই বড়লোক হওয়ার সুযোগ আসে। সেটা হচ্ছে রিটায়ার্মেন্টের সময়ে, যখন সারাজীবনের কষ্টের টাকা অবশেষে গল্পের সোনার হরিণের মতো এসে ধরা দেয়। সেখানেও অবশ্য কথা আছে। ধার-দেনা থাকলে শোধ করতে হয়। বাকি জীবন চলার মতো টাকা জমিয়ে রাখতে হয়। যারা হিসেব করে চলে তাদেরকে অনন্তকাল হিসেবই করে যেতে হয়… কারো হিসেব মিলে, কারো মিলে না।

আমার প্রায়-রিটায়ার্ড বাবাকে আমি জিজ্ঞেস করলাম – তুমি রিটায়ার করে কি করতে চাও?

বাবা বললো – জানি না, দেখি।

প্রাইভেট ব্যাংকে ঢুকতে পারো। নাকি কনসাল্টেন্সি করবা?

মনে হয় সোশ্যাল ওয়ার্ক করবো।

কথাটা শুনে তখন টাশকি খেলাম, তারপর অনেক চিন্তা করে দেখলাম। যখন বুঝতে পারলাম, ততদিনে আমার চুল-দাঁড়ি পেকে গেছে।

আমার বাবা টাকা জিনিসটার নাড়ি-নক্ষত্র বুঝলেও সেটা তার সার্ভাইভাল মেকানিজম মাত্র। একটা অফিসে চাকরি করতে করতে যেমন তার বিভিন্ন প্রসেস মুখস্থ হয়ে যায়, অনেকটা সেরকম। বড়লোক হওয়াটা কখনোই তার জীবনের লক্ষ্য ছিল না; তার সারাজীবনের স্বপ্ন বড় মানুষ হওয়া, মানুষের উপকারে আসা। (আমার খুব বলতে ইচ্ছা করছে, বাবা তুমি এখন বড় মানুষ হয়ে গেছো, কিন্তু আমার ধারণা কথাটা সে অ্যাপ্রিশিয়েট করলেও বিশ্বাস করবে না।)

রিটায়ার্ড বাবাকে একদিন টিপ্পনী কাটলাম – তুমি তো ফকির, সোশ্যাল ওয়ার্ক কীভাবে করবা?

বত্রিশ দাঁত বের করে সে বললো – আমরা তো পীর-ফকিরের বংশ, এ আর নতুন কি?

আচ্ছা সিরিয়াসলি বলো তো? টাকা শেষ হয়ে গেলে কী করবা?

দেখি, একটা ব্যবস্থা করতে হবে।

হুম।

দেখো, আমি তো নিশ্চয়ই একা না তাই না? আমার মতো অনেকেই আছে যারা গরিব মানুষকে সাহায্য করতে চায়, কিন্তু নিজেদের ফিন্যানশিয়াল অবস্থা টাইট। একটা না একটা ব্যবস্থা হবে।

আমার তখনই বোঝা উচিত ছিলো যে সত্যি সত্যি একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে।

কয়েক মাস অক্লান্ত পরিশ্রমের পর বাবা একটা প্রকল্প দাঁড় করিয়ে ফেললো – সীমিত দানের টাকাকে কিভাবে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কাজে বারবার বিনিয়োগ করার যায়। দেখতে দেখতে প্রজেক্টের ফিল্ড টেস্ট হলো। বাবা একের পর এক প্রজেক্ট মডেল তৈরি করলো; এক জেলা থেকে আরেক জেলায় প্রজেক্টগুলি ছড়িয়ে পড়লো। সফলও হলো – কয়েক শ’ দুঃস্থ পরিবার আজ সেই আইডিয়ার সুবিধাভোগী। এদের মধ্যে অনাথ, বিধবা, পঙ্গু, অশীতিপর, সব ধরনের মানুষ আছে। বাবার সাথে তাদের একটা ব্যাপারে খুব মিল – তারা কেউ হারতে পছন্দ করে না। সেটা ব্যালেন্স শিটের কাছে হোক বা জীবনের কাছে।

স্বপ্নের কখনো সারমর্ম হয় না। কিন্তু দেখতে দেখতে আমার বাবা ‘সহায়তা চক্র’ নামে একটা বইও লিখে ফেললো। বইটা একাধারে তার স্বপ্নযাত্রার বিবরণ এবং প্রজেক্ট ম্যানুয়াল। যারা সীমিত বাজেটের মধ্যে কার্যকরভাবে দরিদ্রদেরকে সাহায্য করতে চান, আমি (নিরপেক্ষভাবে) মনে করি বইটা তাদের জন্য অবশ্য পাঠ্য। এমনিতে কাউকে অর্থসাহায্য করলে টাকাটা শুধু একটা ক্ষেত্রে ব্যয় হয়, কিন্তু সহায়তা চক্রের মডেল অনুসরণ করলে সেই একই টাকা দিয়ে বহু মানুষ একই পরিমাণ সুফল ভোগ করতে পারে।

ভালো কাজের জন্য এর চেয়ে ভালো ইন্টারেস্ট রেট আর কোন বই পড়ে পাবেন বলে মনে হয় না।

বইয়ের ডিটেইলস:

নাম – সহায়তা চক্র লেখক – নবী নেওয়াজ মাহমুদ প্রথম প্রকাশ – বইমেলা, ২০১৮ প্রকাশক – অনন্যা

এই লেখককে আরও পড়ুন