বাংলাপ্রিয়বিভাগ
প্রবন্ধ

সেই ইন্দ্রপ্রস্থ

লেখার আকার

আল্লামা শফীরা কেন সর্বোচ্চ স্বাস্থ্যসেবা পান, আর ডাঃ মঈনরা কেন পান না – সেই ইন্টারেস্টিং প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদেরকে বেশ খানিকটা পেছনে যেতে হবে। মানে কাঁটায় কাঁটায় প্রায় দুই হাজার বছর।

হিন্দুধর্ম তখনো একীভূত হয়নি। প্রাচীন ভারতের এক একটা সম্প্রদায় এক একটা দেব-দেবী বা দৈবিক ধারণার উপাসনা করে। এদের মধ্যে সবচেয়ে বড় দুটো সম্প্রদায় শৈব (যারা শিব/রুদ্র’র উপাসক) আর বৈষ্ণব (যারা বিষ্ণু’র উপাসক; বাউল-বৈষ্ণব অর্থে না)। কখনো শিবের ছবি দেখে থাকলে লক্ষ্য করবেন, তার গায়ের রঙ সাদা। সেই সাদা আসলে তিনি শ্মশানের ছাই মেখে থাকেন, সেজন্য – জীবন জিনিসটা যে কত নশ্বর, সেটা বোঝাতে এমন ফ্যাশন স্টেটমেন্ট।

ঐ আমলে শৈবদের একটা রীতি ছিল। যজ্ঞ, মানে পূজার অনুষ্ঠানে তারা শ্মশানের ছাই-ভস্ম একটু জিভে লাগাতো। বলা বাহুল্য, কাজটা তারা করতো শিবের ছাই-মাখার পারম্পিরকতায়। কিন্তু যেহেতু সেই ছাই-ভস্মে আক্ষরিক অর্থেই মানুষের হাড়গোড় থাকতো, বৈষ্ণবদের চোখে রীতিটা হয়ে গেল পাশবিক। শৈবদেরকে তারা ডাকতো মানুষখেকো, শ্মশানের ভূত, রাক্ষস, ইত্যাদি বলে।

ফলাফল – আর কি? আমাদের উপমহাদেশের ঐতিহ্য, কাটাকাটি।

প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তিক্ততাটা বাড়তে বাড়তে একসময় জাতিগত সংঘাতের রূপ নেয়। দুই গোত্রই শক্তিশালী। প্রথমে সবাই ভেবেছিল, যে-কেউ জিততে পারে। কিন্তু মারামারিটা শেষমেষ খুব একপেশে হয়।

বৈষ্ণবরা এমনই কচুকাটা হয় যে তাদের মাত্র কয়েকশ’ পরিবার টিকে থাকে। বিতাড়িত হয়ে তারা ছড়িয়ে পড়ে উত্তর ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে। উপমহাদেশে রাজনীতি আর ধর্মের মাখামাখি আসলে তখন থেকেই। বা কে জানে, হয়তো আরো আগে থেকে। অতীশ দীপন্করের বাংলাদেশে বৌদ্ধদের সংখ্যা এত কম কেন, সুফি ইসলাম জনপ্রিয় না হয়ে ‘গরম পীর’রা হলেন কেন – সেসব প্রশ্নেরও একই উত্তর, কচুকাটা।

ব্যাপারটা যে শুধু উপমহাদেশের লোকজনদের মধ্যে, তা না। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) মারা যাওয়ার পরপরই তার সহচরদের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে যায়। শিয়া-সুন্নির বিভাজনটা তখন থেকেই। উসমান (রাঃ)য়ের হত্যাকান্ডের প্রতিবাদ গড়ায় যুদ্ধে; সেই যুদ্ধে আলী (রাঃ)য়ের সৈন্যবাহিনীর বিরুদ্ধে নেতৃত্ব দেন স্বয়ং আয়েশা (রাঃ)। হেরে গিয়ে বাকিটা জীবন তিনি মদিনায় নির্বাসিত ছিলেন।

১৯৪৭য়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মও হয়েছিল ধর্মকে রাজনীতিতে টেনে আনার জন্যে। মুসলিম জাতিগোষ্ঠির জন্য আলাদা দেশ হবে, হিন্দুদের তাবেদারি তাদেরকে আর সহ্য করতে হবে না – এই আইডিয়াটা যথেষ্ট জনপ্রিয় হলেও, গান্ধী-নেহেরুদের ড্যাশিং সেক্যুলারিজমের জন্য ঠিক সফল হচ্ছিল না। অনেক নামকরা মুসলিম উলামাই ইন্ডিয়া ভাঙার ঘোর বিরোধী ছিলেন, তার উপর মুসলিমরা তখনো ইন্ডিয়ায় সংখ্যালঘু।

কংগ্রেস এবং সেক্যুলার-ঘরানার উপমহাদেশীয় রাজনৈতিক দলগুলি আসলে বরাবরই ধর্মের ম্যাস অ্যাপিলকে আন্ডারেস্টিমেট করে আসছে। একদিন হঠাৎ শুয়োর-খেকো, মদখোর জিন্নাহ সাহেব একটা চাঁদ-তারা পতাকা উঁচিয়ে হাঁক দিলেন – কুরআনে বনি ইসরাইলদের কথা আছে, হুনছেন আপ্নারা?

উপস্থিত লোকজন বললো – হ্যা হুনছি।

আমরা হৈলাম সেই বনি ইসরাইল। আল্লার খাস লোক।

(কেউ কেউ চোখ মোছে।)

কারবালা মনে আছে, কারবালা?

(আরো অশ্রুবর্ষণ।)

চলেন নতুন দেশ করি। আমি কথা দিতেছি, সেখানে এই মালাউনের দ্যাশের থিকা অনেক ভালো থাকবেন।

সেই দ্যাশের নাম কী?

পাকিস্তান।

পা-কি-স্তা-ন! পা-কি-স্তা-ন!

চলেন সেই দ্যাশে যাই।

পা-কি-স্তা-ন যাই! পা-কি-স্তা-ন যাই!... খাড়ান জিন্নাহ ভাই, কেম্নে যামু, দ্যাশটা কোথায়?

জিন্নাহ সাত-পাঁচ কিছু একটা বোঝান। ট্রেন ভাড়া উনি দেবেন কিনা, উপস্থিত কেউ একজন সেই প্রশ্ন করে রাম ঝাড়ি খায়।

আগস্ট মাসে পাকিস্তানের প্রসববেদনায় বর্ডারে বর্ডারে মারা যায় অজস্র মানুষ। রক্তাক্ত টুপি পড়ে গদিতে বসতে বসতে নতুন রাষ্ট্রের কায়েদ-এ-আজমের মনে পড়ে যায়, নেহেরুর মতো তিনিও ব্যারিস্টারি করা, সেক্যুলার। তার উপর এখন খলিফা। দেওবন্দি-পাশ লোকজন পোষার দরকার নাই।

স্বাধীনতার মাত্র বছরখানেকের মধ্যেই জিন্নাহ পাকিস্তানকে এতিম করে পরপারে চলে যান। তার একমাত্র সন্তান দিনা ওয়াদিয়া কখনো পাকিস্তানে যাননি। আজও দিনার বংশধররা বোম্বেতে আছেন। মারা যাওয়ার আগে জিন্নাহ সাত কোটি বাঙালিকে রাগাতে সক্ষম হয়েছিলেন। শেষপর্যন্ত তাদেরকে দাবিয়ে রাখা যায়নি।

জিন্নাহ-পরবর্তী সেক্যুলার-অক্যুলার পাকিস্তানী রাষ্ট্রনায়করা আবিষ্কার করেন, জিন্নাহ যেই ইসলামী সেন্টিমেন্টকে পুঁজি করে পাকিস্তান গড়েছিলেন, সেটা ভাঙিয়ে এখনো কিছু ভোট পাওয়া যায়। আজ অবধি সেই পরম্পরা চলছে। স্বাধীন বাংলাদেশে জিয়াউর রহমান যখন ধর্ম-ভিত্তিক রাজনীতির উপর বিধিনিষেধ তুলে নিলেন, তখন বোধহয় তিনি কল্পনাও করেননি কত বড় একটা আর্কিটাইপাল প্যাঁচে দেশটা পড়তে যাচ্ছে। শৈব-বৈষ্ণবদের হিস্ট্রি খুব সম্ভবত তার জানা ছিল না; ভারতের কংগ্রেসের অন্তত সেটা জানা উচিৎ ছিল, কিন্তু তারাও জানতো না, বা জানলেও পাত্তা দেয়নি। যে কারণে বাড়ির পাশের সুপারপাওয়ারটা এখন গোমুত্র দিয়ে করোনা সারানোর চেষ্টা করছে।

জেনারেল এরশাদের পীর-প্রীতির কথা নাই বা বললাম। তার পরবর্তী সবগুলি সরকারের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ প্রশ্রয়েই যে কিছুদিন পরপর বাংলাদেশে হাউকাউ করে ভাস্কর্য ভাঙা হয়; মেয়েছেলের পোশাক নিয়ে গরম গরম ওয়াজ হয়; কে নাস্তিক, কে নাস্তিক না সেটা নিয়ে বায়তুল মোকাররমের সামনে মিছিল হয়; দুনিয়ার ছেড়িদের বাদ দিয়ে জান্নাতের হুরীদের টোপ ফেলে সুইসাইড বোমারু তৈরি হয়; এবং ডাঃ মঈনদের বদলে শফি হুজুররা অ্যাম্বুলেন্সে যায় – আপনি যেই পার্টিরই সমর্থক হোন না কেন, সেসব অস্বীকার করার উপায় নেই।

তাহলে আমরা যারা ছাগলের মধ্যে ছয় নম্বর ছাগল, তাদের উপায়? আমাদের কি কোনই আশা নাই? করোনা-পরবর্তী ধাক্কায় কি আমরা আফগানিস্থান বা তুরস্ক বা ইরান বা কোন একটা ভজঘট মৌলবাদী রাষ্ট্র হয়ে যাব?

সেটা বলতে পারবো না, কিন্তু একটু আশা দিতে পারি। আর্কিটাইপাল আশা, তাই লেগে গেলেও যেতে পারে।

শৈবদের কাছে কচুকাটা হয়ে-টয়ে বাদবাকি বৈষ্ণবদের মধ্যে যারা প্রধান, তারা একসময় এক জায়গায় জমায়েত হয়। একটা পাহাড়ের গুহায় গোপন বৈঠক বসে। সবার মুখ অন্ধকার। এভাবে হেরে যাওয়া চলে না।

তাদের মধ্যে একজন বলে উঠে – আমরা প্রায় নির্বংশ, সৈন্য নাই, শক্তি নাই, অস্ত্র নাই, কিচ্ছু নাই। আমরা কী-ই বা করতে পারি?

রাতভর মশালের আলোয় আলোচনা চলে। হাল ছেড়ে দিয়ে কেউ কেউ বলে ঠিকই তো, যা হওয়ার হৈছে। অন্যরা বলে, না না না। শেষে কে যেন উপস্থিত সবচেয়ে বয়স্ক মানুষটাকে জিজ্ঞেস করে, আচার্য, আপনিই বলুন কি করবো?

লোকটা অশীতিপর, নামটা ইতিহাসের পেটে কবেই হারিয়ে গেছে। সে বললো – আমাদের একটা কাব্য লাগবে।

অন্যরা অবাক হয়। কাব্য?

হ্যা, কাব্য। গ্রামে গ্রামে কবিয়ালরা কাব্য বলে। সবাই মন দিয়ে শোনে। আমাদের বৈষ্ণব ভাবধারার কাব্য ছড়ায়ে দিতে হবে।

সন্দিগ্ধ একজন বলেই ফেলে, ধুর, কাব্য দিয়ে কখনো যুদ্ধ যেতা যায় নাকি?

বৃদ্ধ ছানি-ঘোলা চোখ মেলে তখন বলে – সেই ছোটবেলায় ইন্দ্রপ্রস্থের কিচ্ছা শুনছি, কার্তিকেয় মেলায়। আজও চোখে ভাসে। নিজের মায়ের চেহারাই এই বয়েসে আর মনে করতে পারি না, কিন্তু চোখ বুজলেই দেখি সেই ইন্দ্রপ্রস্থ... বুঝলে বাছা, সবকিছু যখন শেষ হয়ে যায়, তখন গল্পগুলিই থাকে।

মন্ত্রমুগ্ধের মতো সবাই তার কথা শুনছিল। বুড়োটা লাঠিভর দিয়ে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলতে থাকে – হ্যা, আমাদের অস্ত্রবল নাই, জনবল, অর্থবলও নাই। আমাদের ছেলেমেয়েরা খেয়ে না-খেয়ে থাকে। আমরা বৈষ্ণব, সে-কথা জানতে পারলে লোকে দূর দূর করে। কিন্তু তারপরও মনোবলটা তো আমাদের হাতেই, নাকি?...

আমরা ব্রাক্ষণ, কাব্য বাঁধতে পারি। আজ জিতবো না, কাল জিতবো না, হয়তো আমাদের জীবদ্দশায় আমরা কেউই এই যুদ্ধে জিতবো না। কিন্তু কাব্য যদি সেরকম ভালো হয়, গ্রামে গ্রামে যদি আমরা সেটাকে ছড়িয়ে দেই, তাহলে একসময় না একসময় আমাদের কাব্যটা জিতে যাবে। শিবঠাকুর নিজে থেকেই আমাদের বিষ্ণুর জন্য পথ ছেড়ে দাঁড়াবেন...

মশালের আলো থরথর করে কাঁপতে থাকে, যেমনটা কাঁপে সবার হৃৎপিন্ড। অচিরেই কাজ শুরু হয়ে যায়; কাব্যের বিষয়বস্তু একটা ছোটখাট রাজ্যের বৈষ্ণব রাজার মাহাত্ম্য।

বৃদ্ধের প্ল্যানটা সফল হতে এক-দুইশো বছর লেগে যায়। কিন্তু তারপর থেকে ভারতবর্ষকে শৈবরা আর চিনতে পারেনি। কাব্যটা এত অসাধারণ ছিল যে তারা তাতে আপত্তিও করেনি। উল্টা কাব্যের আদলে আস্তে আস্তে নিজেদেরকে বদলে ফেলেছে। নিজেদের অজান্তেই, পূর্ণ সম্মতিতে এবং বিনা রক্তক্ষয়ে তারা ইতিহাসের চাবিগোছা তুলে দেয় প্রায়-বিলুপ্ত একটা জাতির হাতে। পৃথিবীতে cultural subversionয়ের এর চেয়ে ভালো নজির বোধহয় নাই।

সেই কাব্যের নাম রামায়ণ।

প্রার্থনা করি, এই কালবেলায় কেউ বসে বসে ঐরকমই একটা মাস্টারপিস লিখছে। যাতে লেখা থাকবে আমাদের কথা, বাংলাদেশের হৃদয়ের কথা। ইতিহাসের মেঠোপথে সাময়িক হোঁচট খেলেও কিছু যাবে-আসবে না, গল্পের সুতা ধরে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ঠিকই পথ খুঁজে নিবে। আমরা অধীর আগ্রহে সেই দিনের অপেক্ষায় থাকবো, আমাদের ইন্দ্রপ্রস্থে।

এই লেখককে আরও পড়ুন