বাংলাপ্রিয়বিভাগ
প্রবন্ধ

দর্শন-দিগ্‌দর্শন: রবীন্দ্রনাথ ও বব ডিলান

লেখার আকার

পরিশেষে এটা একটা ইতিবাচক পোস্ট।

সময়টা খুব অদ্ভুত যাচ্ছে বললেও কম বলা হয়। যতদিন ধরে বায়ুমন্ডলের সাথে শ্বাস আদান-প্রদান করছি, এত থমথমে সময় আগে কখনো দেখিনি। কাউকে ফোন করার আগে, বা ইন্টারনেটে কোন লিংকে ক্লিক করতে গিয়ে ভয় হচ্ছে – কে, বা কতজন?

যেন ‘খবর’ মানেই কেউ না কেউ মারা গেছে… অথবা আক্রান্ত হয়েছে… অথবা আক্রান্ত হওয়াটা সময়ের ব্যাপার মাত্র, সেজন্য অগ্রিম আতংক। তার চেয়েও ভয়ংকর ব্যাপার, আমরা সবাই এসবে কেমন যেন অভ্যস্ত হয়ে গেছি। এরকম বেখাপ্পা সময়েও আমার মন খারাপ হয়ে গেল ফেইসবুকে একদম সহজ-সরল একটা স্ট্যাটাস পড়ে।

বেগুনি ব্যাকগ্রাউন্ডে বড় বড় সাদা অক্ষরে একজন লিখেছে – “কেউ প্লিজ জানাবেন করোনার মধ্যে কিভাবে পজিটিভ থাকা যায়?” সাথে একটা স্যাড ফেইস ইমো।

আমার মনে হয়, এই সময়ে পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষ ঠিক একই সিচুয়েশনে। তারা মন খারাপ করে আছে। কয়েকদিন ধরে উত্তরের আশায় সেই স্ট্যাটাস-প্রশ্নটা আমার মাথার ভেতরে ঘুরপাক খাচ্ছে। খুব ভালো উত্তরের দরকার নাই; স্কুল জীবনে প্রায়ই বাংলা প্রথম পত্রের পরীক্ষা দিতে গিয়ে আবিষ্কার করতাম, যে-কোন মুহূর্তে ঘন্টা পড়বে, কিন্তু তখনো চার মার্কের একটা প্রশ্ন অ্যান্সার করা বাকি। মান বাঁচাতে তখন তড়িঘড়ি করে একটা উত্তর লিখে ফেলতাম, দেড়-দুই-আড়াই যা পাই, তা-ই সই।

২০২০ এ এসে আমার একই রকম অনুভূতি হচ্ছে। (সময় জিনিসটা বোধহয় তরল – না হলে গড়িয়ে গড়িয়ে আমি স্কুল-কলেজ ছাড়ার এত বছর পর সেই বাংলা পরীক্ষার মুহূর্তটায় কিভাবে উপস্থিত হই?) যাই হোক, ইউনিভার্সের কাছ থেকে এই পর্যায়ে যদি আধা-খেঁচড়া একটা উত্তরও পাই, চলবে। আসলে এখন যা-ই পাই, চলবে।

কিন্তু কিভাবে আরেকটু ভালো ফিল করা যায়? বিখ্যাত ফ্যান্টাসি লেখক নিল গেইম্যান একটা আশাবাদী মেসেজ ভিডিওতে পড়ে শুনিয়েছিলেন, মাসখানেক আগে সেটা অনুবাদ করেছিলাম। নিজের পোস্ট নিজেই কয়েকবার পড়লাম। কোন লাভ হলো না। মার্চের শেষে “রোগ” নামে একটা গল্প লিখেছিলাম (কোভিড তখনো জেঁকে বসেনি)। সেই গল্পের নাম হওয়ার কথা ছিল “করোনায় ফরিদারা”। ফরিদা নামের তিনজন চরিত্রকে নিয়ে। ঐ সময়ে কোনভাবেই প্লটটা মিলাতে পারছিলাম না বলে গল্পটা কেটে-কুটে সহজ করে লিখেছিলাম।

হয়তো লেখার হাত এখনো কাঁচা বলে ফরিদাত্রয়ীর জন্য আমার মায়া-মায়া লাগে, তাদের কথা লিখতে ইচ্ছা হয়। বিশেষ করে তৃতীয়জনের অংশটা – বিয়ের কথাবার্তা চলছে, এমন একটা মেয়ে। দ্বিতীয় পুরুষে, মানে ‘তুমি’ করে সম্বোধন করে তার অংশটা লেখার কথা ছিল।

বলা বাহুল্য, সেটা আর হয়নি। এরকম মন নিয়ে কি আর গল্প লেখা যায়? একসময় আশার আশায় ক্ষান্ত দিয়ে, মেজাজ-টেজাজ খারাপ করে আমি (আর কি করবো?) অন্যকিছু লিখতে বসে যাই। অনেকদিন ধরেই ভাবছিলাম বব ডিলানের “All Along the Watchtower” আর রবীন্দ্রনাথের “মেঘ বলেছে যাব যাব” গান দুটোর মধ্যে যে অদ্ভুত একটা সাদৃশ্য আছে, সেটা নিয়ে লিখবো।

সেই লেখা লিখতে গিয়ে অবাক হয়ে লক্ষ্য করি, আমি পজিটিভিটির সন্ধান পেয়ে গেছি। শুধু তাই না, গান দুটি আমাদের এই অদ্ভুত সময়ে বেশ প্রাসঙ্গিক।


রবীন্দ্রনাথকে বাঙালি পাঠকদের কাছে পরিচয় করিয়ে দেয়ার কিছু নাই, কিন্তু ডিলানকে সবাই চিনতে নাও পারেন। তাই সংক্ষেপে তার পরিচয় দিচ্ছি।

বব ডিলান হচ্ছেন সাহিত্যে নোবেলজয়ী প্রথম সংগীতশিল্পী। (রবীন্দ্রনাথকেও সেই ক্যাটেগরিতে ফেলা যায়, কিন্তু অফিশিয়ালি উনি নোবেল পেয়েছিলেন কবি হিসেবে।) ডিলান ১৯৪১ সালে আমেরিকার মিনেসোটা স্টেটের একটা ছোট্ট বন্দর নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। মাত্র ২১ বছর বয়সে তার প্রথম অ্যালবাম বের হয়। পরের বছর বের হয় দ্বিতীয় অ্যালবাম, The Freewheelin’ Bob Dylan. তারপর থেকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি। আজো তার “A Hard Rain’s a-Gonna Fall”, “Don’t Think Twice, It’s Alright”, “Blowin’ In The Wind”, “Tambourine Man”, “The Times They Are A-Changing”, ইত্যাদি গান মানুষের মুখে মুখে ফিরে।

মজার কথা হচ্ছে, খশখশে গলা হওয়ার কারণে নতুন জেনারেশনের অনেকেই ভাবে, ঐ গানগুলি ডিলান বৃদ্ধ বয়সে গেয়েছেন – যদিও রেকর্ডিংয়ের সময় আসলে তার বয়স তিরিশও হয়নি!

ডিলানের “Like a Rolling Stone” গানটাকে বলা হয় সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ রক গান। সেই অ্যালবামের আরেকটা দারুণ গান হচ্ছে “Desolation Row”, যার বিভিন্ন চরিত্রের মধ্যে আছে সিন্ডারেলা, আইনস্টাইন, শেক্সপিয়রের “ওথেলো” নাটকের ওফিলিয়া, এবং কবি টি. এস. এলিয়ট। গীতিকার হিসাবে ডিলান কোন্‌ পর্যায়ের, সেটা বুঝতে ঐ একটা গানই যথেষ্ট।

ঐতিহাসিক Concert for Bangla Desh-এর পারফর্মারদের মধ্যে বব ডিলান ছিলেন অন্যতম। জর্জ হ্যারিসনকে নিয়ে আমি যেই গল্প-স্টাইলের ট্রিবিউট পিসটা লিখেছিলাম, সেখানে তিনিও একটা চরিত্র। ডিলান গ্র্যামি জিতেছেন দশটা, গানের রেকর্ড বিক্রি হয়েছে একশ মিলিয়নেরও বেশি, গোল্ডেন গ্লোব আর অস্কারও জিতেছেন একটা করে, এবং তার ড্রইং-পেইন্টিং বিভিন্ন আর্ট গ্যালারিতে শোভা পায় (এই দিকটায় রবীন্দ্রনাথের সাথে তার মিল আছে)।

২০১৬ সালে তিনি সাহিত্যে নোবেল প্রাইজ জিতেন… এবং পুরস্কার গ্রহণ করবেন কি করবেন না, সে ব্যাপারে নানা টালবাহানা করেন। রক স্টার বলে কথা!


বব ডিলান সারা জীবনে সবচেয়ে বেশি যেই গানটা কনসার্টে গেয়েছেন, সেটা হচ্ছে “All Along the Watchtower.” গানটা অমর করার কৃতিত্ব অবশ্য গিটার-দেবতা জিমি হেনড্রিক্সের।

আমি নিচে ডিলানের ভার্সনের লিরিক্সই দিচ্ছি।

‘There must be some way out of here,’

Said the Joker to the Thief

‘There's too much confusion,

I can't get no relief.

Businessmen, they drink my wine,

Plowmen dig my earth.

None of them along the line

Know what any of it is worth.’

গানের শুরু দুইজন মানুষের কথোপকতন দিয়ে। তাদের একজন চোর, আরেকজন ভাঁড়। দুটো চরিত্রই আর্কিটাইপাল; চোর-ভাঁড় নাই, এমন সভ্যতা খুঁজে পাওয়া মুশকিল। ভাঁড় অশান্তিতে আছে – তার পরিশ্রমের ফসল এমন লোকজন ভোগ করছে, যারা সেসবের মর্মই বোঝে না।

কেন, কিভাবে এসব ঘটছে সেই কনফিউশন ভাঁড়কে বড় জ্বালাচ্ছে। সে এই পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ চায়।

‘No reason to get excited,’

The Thief, he kindly spoke.

‘There are many here among us

Who feel that life is but a joke.

But you and I, we've been through that,

And this is not our fate.

So let us not talk falsely now

The hour is getting late.’

শুনে-টুনে বন্ধু চোরটা তাকে বোঝায়, অস্থির হয়ো না, অনেকেই জীবনটাকে কৌতুক মনে করে। কিন্তু তুমি আর আমি, আমরা তো ঐসব স্টেজ পার করে এসেছি! এসো এই, মিছেমিছি আলাপ বাদ দেই, দেরি হয়ে যাচ্ছে।

All along the watchtower,

Princes kept the view,

While all the women came and went –

Barefoot servants, too.

Outside in the cold distance,

A wildcat did growl.

Two riders were approaching, and

The wind began to howl.

সংলাপ এখানেই শেষ। আমরা আবিষ্কার করি, একটা দূর্গে রাজপুত্ররা টহল দিচ্ছে। নারী ও নগ্নপদী চাকররা সেই টাওয়ারে যাওয়া-আসা করছে। দূরে কোথাও একটা বুনোবিড়াল মৃদু গর্জন করতে শুরু করে। দুজন অশ্বারোহী টাওয়ারের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে, সোঁ সোঁ শব্দে বাতাস বয়...

ঠাস করে গানের শুরু, ঠাস করেই ইতি। কিন্তু কী সেই কাজ, ভাঁড় যেটার সম্পর্কে বলছিল “দেরি হয়ে যাচ্ছে”? সেটা বুঝতে হলে পদ্যটার আরেকটু গভীরে যেতে হবে।


‘ওয়াচটাওয়ার’ বলতে কোন এলাকা পাহারা দেয়ার জন্য নির্মিত দূর্গকে বোঝায়। কিন্তু ক্রিশ্চিয়ান ট্র্যাডিশনে কথাটার একটা বিশেষ অর্থ আছে।

বাইবেলের বর্ণনা অনুযায়ী ওয়াচটাওয়ার হচ্ছে সেই দূর্গ, যেখানে বসে বসে বিশ্বাসীরা পাপিষ্ঠ ব্যাবিলন নগরীর পতনের অপেক্ষা করেন। ঈশ্বরে অটল বিশ্বাস থাকায় Book of Isaiahতে সেই বিশ্বাসীদের উল্লেখ করা হয়েছে ‘princes’ হিসেবে। একসময় তারা সেই বিশ্বাসের পুরস্কার পেয়েও যান; ধর্ম-যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে ফিরে আসে অশ্বারোহী, অশ্ব-রথ, উট-রথ, ইত্যাদি…

বুঝতেই পারছেন, বিব্লিকাল সেন্সে ওয়াচটাওয়ার আশার প্রতীক। সৃষ্টিকর্তার উপর ভরসা রাখলে, ধৈর্য ধরলে যে একসময় দিন বদলাবেই, সেই কথাই ওয়াচটাওয়ারের উপমাটা দিয়ে বোঝানো হচ্ছে। (নর্থ আমেরিকার ট্রেন স্টেশনগুলিতে প্রায়ই খৃষ্টীয় Jehovah’s Witness সম্প্রদায়ের লোকজনকে একটা পত্রিকা বিলি করতে দেখা যায়, যেটা ৩৬৯টা ভাষায় ছাপা হয় এবং ১৮৭৯ সাল থেকে টানা চলছে। সেই পত্রিকার নাম? The Watchtower.)

ডিলানের গানে অবশ্য ওয়াচটাওয়ার পুরাপুরি উল্টা ভূমিকায়। বাইবেলে দূর্গবাসীদের স্বপক্ষের যোদ্ধারা বিজয়ী হয়ে তাদের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। কিন্তু “All Along the Watchtower”এ অশ্বারোহী একজন চোর ও একজন ভাঁড় – যারা এসেছে নিজেদের জীবনের হিসাব মিলাতে। ‘উল্টিপনার’ সেখানেই শেষ না। চোর-ভাঁড়ের চরিত্র দুইটাও এই গানে ব্যতিক্রম। ‘চোর’ ভাবলেই আমরা অসৎ বা পতিতগোছের কাউকে কল্পনা করি, কিন্তু এই চোর যথেষ্টই মানবিক। ভাঁড়কে সে kindly সান্ত্বনা দেয়, লক্ষ্যে স্থির থাকতে বলে। আবার ‘ভাঁড়’ ভাবলেই মনে হয় হাসি-খুশি কেউ একজন। অথচ এখানে সে বিষন্ন।

ডিলানের গানে এই দুই চরিত্র বঞ্চিত মানুষের প্রতিনিধি। কোন উঁচু দালানে নির্ঝঞ্ঝাট জীবন যাপনের সৌভাগ্য তাদের স্পষ্টতই কখনো হয়নি। ঘোড়ায় চড়ে তারা ওয়াচটাওয়ারের দিকে এগিয়ে আসতে থাকলে ওয়েস্টার্ন ছবির স্টাইলে অশনি সংকেতের মতো একটা বুনোবিড়াল গর্জন করে উঠে, বাতাসও হুংকার দেয়। তার উপর চোরের ভাষ্য অনুযায়ী, This is not our fate… the hour is getting late.

ইংগিতটা স্পষ্ট – ‘ওয়াচটাওয়ার’ বলতে ডিলান আসলে ঘূণে-ধরা আমেরিকান সমাজব্যবস্থাকেই বুঝিয়েছেন। এবং এই দুই অশ্বারোহীর মতো লোকজনই সমাজের উঁচুতলার লোকগুলিকে মাটিতে নামিয়ে ছাড়বে। আশার প্রতীক হিসেবে এভাবেই দুই হাজার বছরের পুরানো উপমাটার পরিবর্তে অধিষ্ঠিত হয় পরিবর্তনকামী মানুষ।

আফটার অল, কবি-সাহিত্যিকরাও আজন্ম সিস্টেমের বাইরের লোক।


কিন্তু আমাদের সুপরিচিত “মেঘ বলেছে যাব যাব” গানটার সাথে এই গানের কানেকশন কোথায়? বলছি, তার আগে গানটা:

মেঘ বলেছে 'যাব যাব', রাত বলেছে 'যাই',

সাগর বলে 'কূল মিলেছে – আমি তো আর নাই'॥

দুঃখ বলে 'রইনু চুপে তাঁহার পায়ের চিহ্নরূপে',

আমি বলে 'মিলাই আমি আর কিছু না চাই'॥

ভুবন বলে 'তোমার তরে আছে বরণমালা',

গগন বলে 'তোমার তরে লক্ষ প্রদীপ জ্বালা'।

প্রেম বলে যে 'যুগে যুগে তোমার লাগি আছি জেগে',

মরণ বলে 'আমি তোমার জীবনতরী বাই'॥

যেহেতু গানটা বাংলায় এবং বেশ সহজ-সরল ভাষায় লেখা, তাই ব্যাখ্যার মধ্যে যাচ্ছি না। মূল প্রসঙ্গে ফেরা যাক; গান দুটোর সাদৃশ্য কী? এক কথায়, ক্যামেরা। ডিলান, রবীন্দ্রনাথ দুইজনই পদ্যকে দিয়ে সিনেমাটোগ্রাফি করিয়ে ছেড়েছেন।

“All Along the Watchtower” গানটা লেখাই হয়েছে সিনেমাটোগ্রাফির নিয়ম মেনে। প্রথমে নায়কদ্বয়কে আমরা কাছে থেকে দেখলাম, তারপর দূর থেকে (zoom in/zoom out এফেক্ট)। তারপর বুনোবিড়ালের ডাক, বাতাসের সোঁ সোঁ, অশ্বারোহী, সুদূর প্রান্তর, ইত্যাদি (ওয়েস্টার্ন ছবির মার্কামারা উপাদান)। কিন্তু establishing shot – মানে সিনেমা শুরুর দৃশ্যটা, যেটায় সিনেমার পটভূমি দেখানোর পাশাপাশি গল্পের mood establish করা হয় – সেটা আমরা পাচ্ছি গানের শেষে। মানে বব ডিলান গল্পটা বলেছেন উল্টা করে! শুরুটা শেষে।

শুধু তাই না, একটা সিনেমার শুটিং শেষ করে এডিটিং করতে হয়। এডিটরের কাজ হচ্ছে দুই সময়ে, দুই জায়গায় শুটিং হওয়া জিনিসও এমনভাবে জোড়া লাগানো, যাতে দর্শকের কাছে খাপছাড়া মনে না হয়। গানটায় সেরকম এডিটিংয়ের আলামতও লক্ষ্য করা যায়: লিরিক্সে ওয়াচটাওয়ারের অংশটার সাথে আগের অংশের কোন সরাসরি কানেকশন নেই। মানে অশ্বারোহী দুজন-ই যে সেই চোর-ভাঁড়, এমনটা কথা কোথাও বলা নাই। পুরা ব্যাপারটাই implied – চরিত্রগুলির পরিচয় নিয়ে যে আমরা নিঃসন্দেহ, সেটা স্রেফ দৃশ্যগুলির sequenceয়ের জন্য।


সংলাপভিত্তিক হয়েও “মেঘ বলেছে যাব যাব” গানটা ট্র্যাডিশনাল অর্থে ঠিক সিনেম্যাটিক না। প্রথমত, গানটায় বারবার perspective বদলে যাচ্ছে (একবার মেঘ, একবার রাত…)।

ফিল্ম মেকিংয়ের দৃষ্টিকোণ থেকে প্রত্যেকটা চরিত্রের জন্য আলাদা আলাদা শট নিয়ে বা কম্পিউটারে generate করে জোড়া লাগানো যায়, কিন্তু সেরকম করলে “মেঘ বলেছে যাব যাব”র একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক আমরা হারাবো। সেটা হচ্ছে সময়।

ডিলানের গানটায় characterization implied. রবীন্দ্রনাথের গানটায় সময়ও সেরকম implied. ‘আমি’র সাথে একাত্ম হয়ে পাঠক বা শ্রোতা মেঘ, সাগর, দুঃখ, ভুবন, গগন, প্রেম ও মরণের সাথে কথা বলে। কিন্তু সেটা জীবনতরীর ভেলায় ভেসে, অর্থাৎ বেঁচে থাকার সময়টুকুর মধ্যে। যেজন্য ‘সময়’ জিনিসটাকে রবীন্দ্রনাথ এখানে সরাসরি উল্লেখ করেননি – দরকারই হয়নি। এখানেই গানটার (এবং রবীন্দ্র-প্রতিভার) বিশালতা।

আরো চ্যালেঞ্জ আছে, হে ডিরেক্টর। গানটার শেষ লাইন হচ্ছে, “মরণ বলে 'আমি তোমার জীবনতরী বাই'”। মেঘ, রাত, দুঃখ, প্রেম, ইত্যাদি সবই জাগতিক বা জগৎ-প্রসূত। মৃত্যু সেগুলির মতো না – সে স্বতন্ত্র, সাবলীল, এবং প্রচন্ড। এই সেন্সটাও গানটায় আছে। এরকম একটা সেন্স শুধু ক্যামেরায় ধারণ করে বোঝানো যায় না। বহির্দৃষ্টি থেকে এক লাফে অন্তর্দৃষ্টিতে যাওয়ার টেকনোলজি এখনো আবিষ্কার হয়নি… নাকি হয়েছে?

পুরাপুরি না হলেও, কিছুটা হয়েছে। সেই টেকনোলজির নাম ভিডিও গেম টেকনোলজি। সিনেমা হলে আপনি স্রেফ দর্শকের ভূমিকায়। D-Box সিটে বসলে বোনাস হিসাবে অ্যাকশন সিনগুলিতে একটু কাঁপাকাপি উপভোগ করবেন, বা 4D সিনেমা হলে বৃষ্টির দৃশ্যে একটু পানির ছিটা খাবেন – এই যা। শেষ পর্যন্ত সিনেমার জগৎটার সাথে আপনার সম্পর্ক হচ্ছে বহিরাগতের সম্পর্ক।

ভিডিও গেমে তা না, বিশেষ করে first person গেমগুলিতে। দেখার পাশাপাশি আপনি যেই ক্যারেক্টারটা নিয়ে খেলছেন, সেটাকে নড়াতে-চড়াতে হয়, এদিক-ওদিক নিয়ে যেতে হয়, এবং সর্বোপরি গেমের জগৎটা experience করতে হয়। খেলতে খেলতে আপনাকে ভিডিও গেমের ‘আমি’র কতটুকু লাইফ অবশিষ্ট আছে, সেই খেয়াল রাখতে হয়। লাইফ বাড়ানোর উপায় খুঁজতে হয়, জেতার মতো সিচুয়েশনে জিততে হয়, মৃত্যুর সম্ভাবনা থাকলে পালাতে হয়…

“মেঘ বলেছে যাব যাব” গানটাও যতটা না শোনার বা পড়ার ব্যাপার, তার চেয়ে বেশি experience করার। নিজেদেরকে আমরা আবিষ্কার করি সেই মেঘে-ঢাকা রাতে, নাম-না-জানা সেই সাগরতীরটায়। দুঃখকে পেছনে ফেলে আমরা সেই সমুদ্রতটে হাঁটতে থাকি, চারপাশের পৃথিবী দেখি, আকাশ দেখি।

পুরা বিশ্বব্রহ্মান্ড কখন যেন ‘আমার’ সাথে একাত্ম হয়ে যায়। ভালোবাসার মানুষটার কথাও মনে পড়ে, তারপর হঠাৎ খেয়াল হয় – পরিপূর্ণ এই বিভাবরীর আড়ালে লুকিয়ে আছে আশ্চর্য এক শূন্যতা।

আমার পিছনে কি কেউ দাঁড়িয়ে আছে? কই, কেউ না তো।

ততক্ষণে আমি এবং কবিতার ‘আমি’ দুজনই বুঝে গেছি, সেই শূন্যতার নাম মৃত্যু।


বব ডিলান “All Along the Watchtower” লিখেছিলেন আমেরিকায় বর্ণবাদ-বিরোধী Civil Rights Movement এবং ভিয়েতনাম যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর “মেঘ বলেছে যাব যাব” লিখেছিলেন প্রথম বিশ্বযু্দ্ধের সময়টায়, যখন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়।

History repeats itself. এই ২০২০ সালে এসে আমরা আবিষ্কার করছি, ডিলানের হোম স্টেট মিনেসোটাতেই কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েডকে শ্বেতাঙ্গ পুলিশ অফিসার অত্যাচার করে মেরে ফেলেছে। কবিগুরুর ভারতবর্ষ স্বাধীন হয়েছে অনেক আগেই, কিন্তু এখনো যে তার নাগরিকরা পরাধীন, সেটা করোনা-কালে মোটামুটি প্রমাণিত।

এই লেখাটা আসলে শুরু করেছিলাম অনেক আগে। এর মধ্যে এক জনদরদী ডাক্তারকে তার পেশেন্টের আত্মীয়রা পিটিয়ে মেরে ফেলেছে। ঢাকা থেকে এক মহিলা স্বামীর লাশ নিয়ে ফিরে জেনেছেন, একদল নরপশু তার একমাত্র মেয়েকে রেপ করে মেরে ফেলেছে। দলে দলে লোকজন ঢাকা থেকে গ্রামে ফিরে যাচ্ছে, কিন্তু ঈদের মৌসুমেও এই যাত্রায় কোন আনন্দ নেই – এই ফেরা না-খেয়ে মরার হাত থেকে বাঁচার অন্তিম প্রচেষ্টা। ব্রাক্ষণবাড়িয়াতে এক শিশুর লাশ উপড়ে ফেলে কবরস্থানের বাইরে ফেলে রাখা হয়েছে, সে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের বলে। এবং রিজেন্ট হাসপাতাল, আরো কত হাসপাতাল, আরো কত লাশ, ইত্যাদি, ইত্যাদি।

কিন্তু এসব ঘটনাগুলির জন্য কি আসলে করোনা দায়ী? শেক্সপিয়রের “রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট” নাটক সম্পর্কে অনেক আগে মাত্র ছয় পাতার একটা নজর-কাড়া একাডেমিক পেপার পড়েছিলাম। লেখক সেখানে ব্যাখ্যা করেছেন, গরমের কারণে মেজাজ একটু খিঁচড়ে থাকার সম্ভাবনা থাকে, তাই পরিস্থিতি প্রতিকূল হলে খুনাখুনির চান্সও বেড়ে যায়। যেজন্য রোমিও-জুলিয়েটের ট্র্যাজেডির পেছনে ওয়েদারের কিছুটা হলেও হাত ছিল।

আমাদের দেশটাই তো গরম, তার উপর এখন মহামারী – সেজন্যই কি চারদিকে এত বিচিত্র নিষ্ঠুরতা?

আমার মনে হয় এই প্রশ্নের উত্তর আমরা সবাই জানি। আমরা আসলে এরকমই। এখন সিচুয়েশন খারাপ বলে হয়তো আমাদের কলুষগুলি গরু-ছাগলের হাটের মতো ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের ইজারা নিয়ে ফেলেছে।

জ্ঞান হওয়ার পর থেকে দেখছি ভিআইপিরা চিকিৎসা করতে দেশের বাইরে ছোটেন – এখনো যে ছুটবেন, তাতে বিস্ময় কী? যে রাষ্ট্রে দুই হাত শরীরের থেকে আলাদা করে নারীশিশুকে গ্যাং রেপ করে মেরে ফেলা হয়, সেখানে যে করোনার পেশেন্টকে ওয়ার্ড বয় ধর্ষণ করার চেষ্টা করতে গিয়ে ধরা খায় – সেই খবরে ব্যতিক্রম শুধু ধরা খাওয়ার ব্যাপারটা।

ডিলান বা রবীন্দ্রনাথের মতো আমরাও ইতিহাসের ক্রান্তিলগ্নে দাঁড়িয়ে। আবার কবে জীবন স্বাভাবিক হবে? আদৌ কি হবে? ‘স্বাভাবিকতা’ আসলে কী? এসব প্রশ্নের আপাতত কোন উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না। তবে আমরা ঐ দুই কালজয়ী প্রতিভার দেখিয়ে দেয়া পথে এগোতে পারি। মহাকালের পথে হাঁটতে হাঁটতে, বা অববোধনের অশ্বে চেপে হয়তো আবার আমরা পৌঁছে যাবো সুসময়ে।

দুইজনের মেসেজে খুবই মিল – দেখার পরিসর বাড়াতে হবে। ডিলানের activismটা প্রত্যক্ষ, তাই তার লেন্সে ধরা পড়েছে সমাজের যাঁতাকলে পিষ্ট মানুষ; তাদের মুক্তির একমাত্র উপায় নিজেদের অধিকার নিজেরা আদায় করে নেয়া। আর রবীন্দ্রনাথ স্বাধীনতা সংগ্রামের স্বরূপ খুঁজেছেন আত্মশুদ্ধিতে – সময়ের কোলাহলের সমাধান তিনি দেখেছেন অন্তরে, আত্মার বৈশ্বিকতায়।

হয়তো এই সময়টা অনিবার্য ছিল, আমাদের নিজেদের স্বার্থেই। হয়তো এই সময়টা অবশ্যম্ভাবী ছিল, আমাদের কৃতকর্মের কারণেই। তবে এটা মোটামুটি নিশ্চিত, আমাদের জেনারেশনে যুদ্ধ-বিগ্রহ ছাড়া সবাই মিলে ঘুরে দাঁড়ানোর এরকম সুযোগ আর কখনো আসবে না।

ভালো থাকতে হলে এই দুর্বার দুঃসহনীয়তায় তাকাতে হবে নিজেকে ছাপিয়ে, নিজের গভীরেও।


“ফরি! ও ফরি!”

ফরিদা নামের মেয়েদের এই এক যন্ত্রণা – অপভ্রংশ হতে হতে তাদের নামগুলি প্রায় ফড়িং হয়ে যায়। তোমার বাবা এভাবে ডাকাডাকি করলে সাধারণত তুমি বিরক্ত হও। এটা কোন ডাকের ছিরি হলো? শুনলেই মনে হয় কেউ ঠাস করে পড়ে যেতে নিচ্ছে। পঁচিশ বছর ধরে বাবাগিরি করেও লোকটার কোন কমনসেন্স হলো না। বের হয়ে শান্টিং দিতে হবে। অবশ্য শান্টিং দিয়েও লাভ নাই, তোমার ঝাড়ি খেয়ে সে ফাঁকা ফাঁকা দাঁতগুলি বের করে রুম কাঁপিয়ে হাসবে।

কিন্তু আজ তোমার মনটা এসবে নাই, অন্য কোথাও।

“মা, তাড়াতাড়ি আয়। ওরা চৈলা আসছে!”

তুমি কাঁদছো। এমনিতে খুব একটা কান্নাকাটি করো না তুমি। এখনো যে কাঁদছো, সেটা নিঃশব্দে। ভোরের শিশিরের মতো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অশ্রুবিন্দু তোমার পাঁপড়িগুলির সাথে লেপ্টে আছে। তুমি একটু পরপর সযত্নে সেগুলি মুছে ফেলছো।

এরকম কেন হচ্ছে তোমার? তোমার হবু বরটাকে তো তোমার পছন্দই। পছন্দ করো দেখেই তো সে এখন ফ্যামিলিসহ তোমাদের আজিমপুর কলোনির ফ্ল্যাটটায় হাজির। ঠিক না?

উহু, ব্যাপারটা এত সিম্পল না। ইদানিং তোমাদের ঝগড়াঝাটি বেশি হচ্ছে দেখে বরবাবুর মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। উপরন্ত বাসায় থাকতে থাকতে, ডেটিং না করতে করতে, এবং কোভিডের জন্য তার আমেরিকায় পিএইচডি করতে যাওয়া আটকে যাওয়ায় ধারণা হয়ে গেল, তোমাদের ব্রেক-আপ হতে যাচ্ছে।

কত করে তুমি তাকে বোঝালে, কিন্তু বুঝলো আর কই! বাসায় প্রেশার দিয়ে ব্যাটা বাবা-মা-চৌদ্দগুষ্টিকে রাজি করিয়ে ফেললো। এখন তারা সবাই মেয়ে দেখতে চলে এসেছে। সেই মেয়েটা তুমি। ভাবা যায়? ঐ তো ঐ মেয়েটা, বাথরুমের আয়না থেকে যে তোমার দিকে তাকিয়ে আছে।

“আসতেছি বাবা,” বা এরকম কিছু একটা বলে তুমি আবার নিজের দিকে মন দাও। তোমার পরনে নতুন শাড়ি, চুলটা এখনো এলোমেলো, চোখে কাজল, কাজলের নিচে জল। আজ তোমার জীবনের সবচেয়ে খুশির দিন হওয়ার কথা, কিন্তু তোমার সেরকম খুশি লাগছে না। উল্টা ভয়-ভয় লাগছে – যেন ওদের বাসায় চলে গেলে আর কখনো তোমার নিজের রুমে ফেরার পথ খুঁজে পাবে না।

কী ছেলেমানুষি চিন্তা! কত ভালো সম্বন্ধ, তার উপর নয় বছরের রিলেশনশিপ – জীবনে আর কি চাই? কল ছেড়ে তুমি অনেকক্ষণ পানির ধারার দিকে তাকিয়ে থাকো; মনে মনে নিজেকে সাহস দাও, আমি এই বিয়ে করতে চাই, আমি এই বিয়ে করতে চাই… তবু কেন যেন ভয়টা যায় না।

বাথরুমের দরজা খুলে পাশের রুমে গেলেই যেই মানুষটার সাথে তোমার বিয়ের কথাবার্তা পাকাপাকি হবে, তার নাম অমিত। আদর করে সে তোমাকে ডাকে লাবণ্য বলে।

“কেন?” বিয়েতে তোমার অনীহা দেখে অমিত জানতে চেয়েছিল।

“আশেপাশে মানুষের এত কষ্ট, এর মধ্যে…”

“আশেপাশে সবারই সবসময় কষ্ট থাকে, এখন তোমার হঠাৎ কি হৈলো?”

“না মানে, সময়টা তো আর সব সময়ের মতো না।”

“দেখেন মিস লাবণ্য, আমি কিন্তু পাত্র ভালো। জর্জ মেসন ইউনিভার্সিটির পিএইচডি ক্যান্ডিডেট।”

“জ্বি জানি।”

“হৈছে কি তোমার?”

তুমি বুঝিয়ে বলেছিলে। শুনে ও হাসে। তাই তুমি আর কথা বাড়াওনি, বিয়েতে রাজি হয়ে গিয়েছিলে।

আর এখন? দরজা খুলে বের হওয়ার পর তুমি ঠিক কোথায় পৌঁছবে, ঠিক বুঝতে পারছো না। যেন অমিতের গুষ্টি হাজির হয়ে তোমার বাসার লে-আউটই পাল্টে গেছে।

মন শক্ত করতে তুমি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মেকাপ-এ মন দাও। হায় হায়, কান্নাকাটি করে চোখ-টোখ ফুলে গেল নাকি? নাকফুলটা আজকে বার বার খুলে খুলে যাচ্ছে। তোমাকে কি যথেষ্ট সুন্দর লাগছে? ঠোঁটে গাঢ় লিপস্টিক দিবে, নাকি হাল্কাটা? এমন সময় কথাগুলি ভেসে আসে।

“তা আপনাদের কি কোন গিফ্‌ট দেয়ার প্ল্যান আছে?” একটা বাজখাঁই নারীকন্ঠ বলে।

“কি গিফ্‌ট? দিমু, দিমুনা ক্যান?” তোমার বোকাসোকা বাবাটা বলে উঠে।

“যেমন গোল্ড, বা ফার্নিচার।”

“ও! হ্যা কিছু গহনাপাতি দিবো, আমাদের তো আসলে…”

“দামি কিছু না হলেও চলবে, আসলে সেটাই ভালো হয়। বাহুল্যের দরকার নাই।”

“ও আচ্ছা! যাক তাইলে তো –”

“দশ-পনের লাখের মধ্যে কিছু হলেই চলবে।”

“জ্বি?”

“জ্বি, কোন অসুবিধা আছে? এটা তো মিনিমাম বললাম।”

“…”

দরজার সাথে কান সেঁটে থাকতে থাকতে তোমার দম বন্ধ হয়ে আসে।

“আজকাল কিন্তু বিয়ের জন্য ব্যাংক থেকে লোনও নেয়া যায়, ভাই। আপনি চাইলে আমার বোনের ছেলেকে বলতে পারি, ও ইস্টার্ন ব্যাংকে আছে। ব্যবস্থা করে দিতে পারবে।”

“…জ্বি না, তার দরকার নাই।”

কখন যেন আবিষ্কার করো, তুমি টাইলসের ফ্লোরে হাত-পা ছড়িয়ে বসে পড়েছো। রাগে, অপমানে তোমার গলা ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছা করছে। এত্ত বোকা লোকটা, এত্ত! একবার প্রতিবাদও করলো না! কিন্তু তুমি সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছ অমিতের আচরণে – এরকম একটা কনভার্সেশনে তার কন্ঠ দিয়ে কোন আওয়াজ পর্যন্ত বের হলো না?

মূর্তির মতো তুমি, লাবণ্য কিংবা ফরিদা, বাথরুমের মেঝেটায় অপলক সেঁটে থাকো। বেসিনের কলটা দিয়ে এখনো গলগল করে পানি পড়ছে। তোমার মস্তিষ্কের শিরা-উপশিরা দিয়ে বইছে হাজারো প্রশ্ন, বা হয়তো একটা প্রশ্নই বইছে হাজার বার: আজ কি নতুন কোন অমিত তোমাদের বাসায় চলে এসেছে, নাকি তুমিই তাকে এতদিন চিনতে পারোনি? বাতাসে ভয়-ভয় গন্ধ, হসপিটালে রোগীদের লাইন, তোমাদের বাসার ছুটা বুয়াটা দুই সপ্তাহ ধরে উধাও, মানুষজনের হুশ নাই বা হয়তো হুশটুকুই সম্বল, সিগনালে সিগনালে যে বাচ্চাগুলি ফুল বিক্রি করে তারা আল্লাহই জানে কেমন আছে, পাশের বিল্ডিঙের সিঁড়িঘরে অনেকক্ষণ একটা লাশ পড়ে ছিল… এরকম একটা দুঃসময়ে তোমার যে বিয়ে করতে ইচ্ছে করছে না, সেটা কি অমিত বোঝেনি ঐজন্যই – সে বরাবরই তোমার অপরিচিত বলে?

“ফরি! ও ফরি! দেরি হৈতেছে রে মা!”

চমকে উঠে তুমি অটোমেটিক উঠে দাঁড়াও। কিন্তু আয়নায় এবার যাকে দেখতে পাও, সে আর যে-ই হোক, লাবণ্য না। কে তুমি? কি করা যায়? কেন করা যায়? আপাতত থাক এইসব চিন্তা, তুমি মনে মনে মনকে বোঝাও, আগে আজকের দিনটা কোন মতে পার করতে হবে।

কিন্তু জলের নিজস্ব একটা সম্মোহনী ক্ষমতা আছে। কলের পানিতে হাত এলিয়ে দেয়ার সাথে সাথেই তুমি একটা ঘোরের মধ্যে চলে যাও। ফুল ফোর্সে পানি বেসিনের গায়ে লেগে ছিটতে থাকে, আর তোমার মনে পড়ে যায় বহুদিন আগে পড়া একটা গল্পের কথা।

আদিকালে অঙ্গদ ও চন্দ্রফোঁটা নামে দুই অপ্সর-অপ্সরী ছিল। তাদের কাজ ছিল দেবতাদের আসরে নৃত্য পরিবেশন করে তাদের মনোরঞ্জন করা। দুজন দুজনকে পছন্দ করতো, কিন্তু নৃত্যই ছিল তাদের প্রথম প্রেম। তাই নাচের মঞ্চে কেউই কাউকে একটুও ছাড় দিতো না।

একদিন দেবতারা নৃত্য প্রতিযোগিতার ঘোষণা দিলেন। প্রতিযোগিতা চলবে এক মাস ধরে, বিজয়ীকে শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট পরিয়ে দেবেন স্বয়ং বিদ্যাদেবী। শুনে স্বর্গের সব অপ্সর-অপ্সরীরা নড়েচড়ে বসলো। প্রস্তুতির তোড়জোড় শুরু হয়ে গেল।

“শুনছো? আমি জিতবো কিন্তু,” অঙ্গদ হাসিমুখে হুমকি দেয়।

“মোটেও না, আমিই জিতবো,” চন্দ্রফোঁটা ঠোঁট উল্টে বলে।

দুজন একসাথে প্র্যাকটিস করতে থাকে, আবার আড়ালে আড়ালে যে যার মতো করে নাচের বিশেষ বিশেষ মুদ্রা চর্চা করে। প্রতিযোগিতার দিন যত এগিয়ে আসে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীতা তত তীব্র হয়।

একদিন অনুশীলনের টুকটাক ভুল নিয়ে অঙ্গদ আর চন্দ্রফোঁটার মধ্যে ঝগড়া লেগে যায়। যেহেতু দুইজনেরই মন নৃত্যতে, এবং পরদিন থেকে প্রতিযোগিতা, তাই মিটমাট না করেই যে যার পথ ধরে।

প্রাথমিক ধাপগুলি দুজনই অনায়াসেই পার করে। কিন্তু স্বর্গে আরো অনেক বাঘা বাঘা নৃত্যশিল্পী আছে। প্রতিযোগিতার পরবর্তী রাউন্ডগুলি মোটেও সহজ হবে না। প্র্যাকটিস করাটা খুব দরকার।

কি করা যায়? অঙ্গদ ভাবে।

অনেক ভেবে-চিন্তে সে চন্দ্রফোঁটার বাড়ি যায়। গিয়ে বলে, “যা হওয়ার হয়েছে, আমরা আমরাই তো, চলো মিলমিশ করে ফেলি।”

দরজার ঐপাশ থেকে উত্তর আসে, “তুমি কি কম্পিটিশনের জন্য মিলমিশ করতে চাচ্ছ, নাকি আমাদের জন্য?”

অঙ্গদ বহু বাক্য, শ্লোক, এবং আশ্বাস ব্যবহার করে চন্দ্রফোঁটাকে বোঝায়, সে তাদের দুজনের জন্যই মিলমিশ করতে এসেছে।

চন্দ্রফোঁটা সব শুনে বলে, “ঠিক আছে, কিন্তু একটা শর্ত আছে।”

“কি শর্ত?”

“আমরা নাচবো ছায়া-যুগলবন্দি কায়দায়।”

“মানে?”

“মানে প্র্যাকটিসের সময় আমি পর্দার আড়ালে থাকবো। পর্দার ছায়ায় আমরা একজন আরেকজনকে দেখে নাচের মুদ্রা শুধরে নিবো।”

“এটা কেমন কথা? এভাবে কি –”

“করলে করো, না হলে যাও।”

“বুঝছি, তোমার ভাব বেড়ে গেছে। ওকে, তাই হবে।”

খুশি মনে অঙ্গদ বাড়ি ফেরে। তারপর থেকে প্রতিদিন সে চন্দ্রফোঁটার সাথে ছায়া-যুগলবন্দি নাচে। প্রতিযোগিতায় সে ভীষণ ভালো করতে থাকে, একের পর এক বাঘা বাঘা শিল্পীকে হারিয়ে সে ফাইনালে পৌঁছে যায়। ফাইনালে তার প্রতিদ্বন্দ্বী – আর কে? চন্দ্রফোঁটা। কিন্তু এ কী হাল হয়েছে তার! চোখদুটো কোটরে ঢুকে গেছে, দেহ শীর্ণ।

ঢোল বাজার আগে অঙ্গদ ফিসফিস করে তাকে জিজ্ঞেস করে, “তোমাকে এরকম বিবর্ণ লাগছে যে?”

চন্দ্রফোঁটা উত্তর দেয় না।

নাচ শুরু হয়। প্রথমে একক নৃত্য। চন্দ্রফোঁটা সোঁ সোঁ শব্দে হাঁপাতে থাকে, কিন্তু তার একটা অঙ্গ-ভঙ্গিও এদিক-সেদিক হয় না। কঠিন কম্পিটিশন। অঙ্গদের ঘাম ছুটে যাওয়ার জোগাড়, কিন্তু সে-ও তুখোড় নাচিয়ে – দর্শকদের উলুধ্বনিই বলে দেয়, দুজনের কেউ কারোর চেয়ে কম না।

তারপর যুগলবন্দি। চন্দ্রফোঁটাকে স্পর্শ করেই অঙ্গদ চমকে উঠে – “এ কি, তোমার গায়ে তো জ্বর!”

চন্দ্রফোঁটা শুধু ফিসফিস করে বলে, “নাচো।”

বলে সে প্রাণপণে নাচতে থাকে। অঙ্গদও নাচে, হাজার হাজার বছর ধরে দুজন যেভাবে নেচেছে একসাথে।

কখন যেন দুজন স্থান-কাল-পাত্র সব ভুলে যায়। তারা কেবল নাচে, নাচতেই থাকে। দর্শকের সারিতে বিদ্যাদেবী ক্ষণে ক্ষণে হাততালি দিয়ে উঠেন। হঠাৎ অঙ্গদের ভয় হয়।

“তুমি মারা যাচ্ছ, তাই না?”

“হ্যা, আমার কর্কট রোগ হয়েছে।”

“এটা কিভাবে সম্ভব? আমি তো তোমাকে ছাড়া জীবন কল্পনা করতে পারি না।”

“সব কিছুই সম্ভব।”

“পথ্যদেবীর সাথে কথা বলেছো? চলো, না হয় আবার তার কাছে গিয়ে –”

“বলেছি। উনিই বলেছেন, এই নাচ শেষ করা পর্যন্ত আমার আয়ু অবশিষ্ট আছে।”

“হায় হায়!”

“চিন্তা কোরো না, আমার মরার কোন প্ল্যান নাই। আমি কোনভাবেই নাচ বন্ধ করছি না।”


পরিপাটি হয়ে ফরি দরজা খুলে। সে এখন গিয়ে অমিত ও তার চৌদ্দগুষ্টিকে একটা রাম ঝাড়ি দিবে।

ঝাড়ি খেয়েও যদি অমিতের মধ্যে বোধোদয়ের আলামত দেখা না যায়, তাহলে সে আর যাই করুক, অমিতের জন্য কখনো চোখের পানি নষ্ট করবে না। সিচুয়েশন-নির্বিশেষে জীবন একটাই।

এই লেখককে আরও পড়ুন