পর্ব ১
স্মৃতিচারণ · · ৪ মিনিটের পাঠ
একবার জুহু বিচে গিয়ে আমার দাদার দেখা হয়ে গেল এক তরুণ গায়কের সাথে। তার ছোট ভাইয়ের বন্ধু।
বোম্বে তখনো ‘মুম্বাই’ হয়নি। এমনকি ইন্ডিয়াই স্বাধীন হয়নি।
বহুকাল পর সেই দেখা-হওয়ার কথা দাদার মনে পড়লো আমার এক অলস দুপুরে। আমি শুয়ে শুয়ে গান শুনছি। উইনঅ্যাম্পে বাজছে মান্না দে’র গাওয়া ‘লাগা চুনরি মে দাগ’ বা এই টাইপ কিছু।
দাদা এমনিতে গান শোনা লোক না, কিন্তু মান্না দে’র গান শুনে সে মুগ্ধ। আমাকে জিজ্ঞেস করলো, কে গাইছে গানটা?
আমি বললাম।
– ‘দে’? মানে এই লোক তো বাঙালি। খুব ভালো গলা তো!
– তুমি মান্না দে’কে চিনো না?
– না। কেন সে কি খুব বিখ্যাত?
– হু।
– অনেকদিন আগে আমার বোম্বেতে একটা ছেলের সাথে কথা হইছিল, খুব ভালো গলা। কি যেন নাম…
– তালাত মাহমুদ? সতীনাথ? নাকি হেমন্ত?
– আরে না, মুসলমান।
– তালাত মাহমুদ তো মুসলমান।
– না, কি যেন নাম… খুব সিম্পল একটা নাম ছিল… যাই হোক, খুবই অমায়িক লোক। বললো মেরা পেহেলা গানা পিকচার মে আয়া, খুব খুশি, সেই গান গেয়েও শুনাইলো কিছুক্ষণ।
– কে, মনে করার চেষ্টা করো তো?
– …
আরো কিছুক্ষণ চেষ্টা করে দাদা হাল ছেড়ে দেয়।
– নাহ্ মনে পড়লো না। যাই হোক, হয়তো সে একটু ফেমাস হইছিল সেই সময়ে… ভারি মিষ্টি গলা।
– গান শুনে তুমি কি করলা?
– বললাম আচ্ছা হ্যায়, অউর রিয়াজ করনা।
– তাই?
– তারপর ভেলপুরি খাওয়ালাম। দেখে মনে হলো ক্ষুধা লাগছে, কতই আর আয় করে! লাইফ তো সবার জন্যই কঠিন। অফার করাতে প্রথমে বলে না না, তারপর বললো আপ ওয়াহিদ কা বড়া ভাই, তো ঠিক হ্যায়।
কিছুক্ষণ পর স্পিকারে বেজে উঠে “ও দুনিয়া কে রাখওয়ালে”। শুনে দাদা পাশের ঘর থেকে দৌড়ে এসে বলে – আরে, এই তো সেই গায়ক! তুই কি করে তার গান খুঁজে পা’লি?
আমি হতভম্ব হয়ে বললাম – তুমি শিওর এই সেই লোক?
– হ্যা, গলাটা কেমন ইউনিক না? খুবই মিষ্টি।
আমার বিশ্বাস হলো না, তাই ভেরিফাই করার জন্য একই শিল্পীর আরো কিছু গান শোনালাম। কনফিউজ করার জন্য অন্য শিল্পীদের গানও শোনালাম। দাদা কঠিন সত্যবাদী, এবং সে তবুও নিশ্চিত যে ঐ সেই গায়ক।
– গায়কটার নাম বল্লিনে?
– মোঃ রফি।
– (হাসি) বলিছিলাম না, সিম্পল নাম! কতদিন পর মনে পড়লো। আওলের (আমার আরেক দাদা, ভালো নাম আউয়াল) সাথে সেই রফি কিছুদিন ঘুরাফিরা করিছিল। আওলের সব লোকজন ছিল ঐরকম, শিল্পী, বিপ্লবী, কবি…
– ওয়েট, তুমি মোঃ রফিকে বলসো আরো প্র্যাকটিস করতে?
– হ্যা, তো?
– তুমি মোঃ রফিকে বলছো আরো প্র্যাকটিস করতে??? তুমি তার গান শুনেও বুঝলা না লোকটা কি জিনিস?
– হ্যা বলিছি। কেন, সে কি খুব ফেমাস?
– …
একজন কিংবদন্তি শিল্পীকে এরকম তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করায় দাদার সাথে আমার ছোটখাট একটা ঝগড়া লেগে গেল। তারপর সে বহু বছর আগে জুহু বিচে তার সেই আচরণের কারণ ব্যাখ্যা করে। কারণটা খুব সম্ভবত আজকালকার জেনারেশনের কেউ বুঝবে না।
দাদার লজিক ছিল, জীবনে কষ্ট করে উঠতে হয়। বোম্বে খুবই নির্মম একটা শহর। সেখানে পদে পদে বাধা, পদে পদে কম্পিটিশন। ব্রিটিশরা তখনো দেশ ছাড়েনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রেশও কাটেনি। কি হবে? কি হতে যাচ্ছে?
চারিদিকে উদ্বেগ, চারিদিকে অনিশ্চয়তা। সেই বিস্তীর্ণ মহাভারতীয় খিচুড়িতে তবু অনেকে স্বপ্ন দেখে, দেশ আজাদ হবে। কিন্তু স্বাধীনতা যেন দূর আকাশের তারা। দেশ আজাদ হতে হতে গিয়েও হয় না।
একজন তরুণ গায়ক ভালো করতে শুরু করেছে, খুবই ট্যালেন্টেড – ভালো কথা। কিন্তু ভাগ্য জিনিসটাকে এক-দুইটা সাফল্য দিয়ে বশ করা যায় না। তাকে দীর্ঘদিন পরিশ্রমের তালিম দিয়ে লাইনে আনতে হয়।
নিভু নিভু স্বাধীনতার প্রদীপটাকে সযত্নে আগলে রাখতে হয়, না হলে স্বাধীন হওয়া যায় না।
(ইদানিং দাদার কথা খুব মনে পড়ছে। তাকে নিয়ে লম্বা একটা লেখা লিখার আশায় ছিলাম, সেটা এখনো হয়নি। তাই আপাতত এই ক্ষুদ্র উপাখ্যান। যেই গানটা কমেন্টে শেয়ার করছি সেটার গায়ক মোঃ রফি – সাথে গায়িকা সুমন কল্যাণপুর।)
[ চলবে ]