বাংলাপ্রিয়বিভাগ
সেই চেনামুখ · পর্ব ১০

পর্ব ১০

লেখার আকার

আমার লন্ডন-জীবনের শেষের সময়টুকু খুব তাড়াতাড়ি কাটে।

বাচ্চাদের স্মরণশক্তি আর ভুলে যাওয়ার ক্ষমতা দুই-ই অসাধারণ। একদিকে আমি প্রাণপণে সেই শহরের, সেই সময়ের স্বাদ-ঘ্রাণ-বর্ণ মনে মনে রেকর্ড করতে থাকি, আর আরেকদিকে এমনভাবে চলি যেন সবকিছু আগের মতোই আছে, সারাজীবন আমি এখানেই থেকে যাচ্ছি।

প্রায়ই মা’র বড় পেটটা জড়িয়ে ধরে আমি আমার অনাগত ভাইয়ের সাথে কথা বলি। শেষ পর্যন্ত সেই ভাই আর আসেনি – তার বদলে যাকে পেয়েছিলাম, সে অবশ্য আমার ভাই না-পাওয়ার কষ্ট কখনো বুঝতেই দেয়নি।

পরিচিত পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হচ্ছে দেখে মাঝেমাঝে গজগজ করতাম। পছন্দের জিনিসগুলি, যেমন শনিবারে কার্টুন দেখা, Monster Munch খাওয়া, স্কুল থেকে ফেরার পথে উদাস চোখে তাকিয়ে থাকা – সেগুলি আরো বেশি বেশি করার চেষ্টা করি। যেন আমার অবচেতন মন বুঝে গিয়েছিল, আর কখনো এই শহরটার সাথে আমার দেখা হবে না।

জিনিসপত্র প্যাকিংয়ের কাজ শুরু হয়। আমাকে অনেক খেলনা এবং অশ্রু ফেলে দিতে হয় – প্লেনে নাকি বেশি জিনিস নিয়ে ওঠা যায় না।

কোন এক কালে লং ড্রাইভে যেতে যেতে আমরা একটা পার্কে থেমেছিলাম। সেখানে একটা ডায়নোসর স্লাইড ছিল, খুবই মজা চড়তে। বাবাকে অনেক করে সাধাসাধি করলাম সেখানে যেন আমাকে নিয়ে যাওয়া হয়। লোকেশন না জানায় সাধাসাধিতে লাভ হলো না।


টাইরানকে মন খারাপ করে বললাম, আমি বাংলাদেশ চলে যাচ্ছি। শুনে তারও খুব মন খারাপ হলো, কিন্তু আমার চেয়ে অনেক বিজ্ঞ সে – বললো, ‘Let’s try to have a good time while we’re still friends.’

তাই আগের মতোই আমরা হাহাহিহি করতে করতে খেলাধুলা, গল্পবাজি, নারীবিদ্বেষী আলোচনা বহাল রাখলাম। চলে যাচ্ছি দেখে স্কুলের টিচারদের কাছে বাড়তি আদর পেলাম – এই আমি-ই যে কিছুদিন আগে আলেকজান্দ্রিয়ার ঝুটি ধরে টার্জানের মতো ঝুলতে গিয়েছিলাম, সেটা মিস মার্গারেটও মনে রাখলেন না।

স্কুলে বুলিদের কাছে একদিন নিজেই হাসিমুখ ধরা দিলাম। আমার পকেট সার্চ করে একটা কয়েন পাওয়া গেল, মা’র কাছ থেকে চেয়ে এনেছিলাম।

দাঁত বের করে বুলিদেরকে বললাম – ‘Take it, I brought it for you.’

মেইন বুলিটা হতভম্ব হয়ে সাগরেদদের দিকে তাকায়। ‘Is he trying to give us money? Like I’m a beggar?’

আমি বললাম, ‘What’s a beggar?’

পয়সাটা আর ফেরত পাইনি অবশ্য। আমাদের সায়েন্স এক্সপেরিমেন্টের ব্যাঙাচিগুলি ব্যাঙে রূপান্তরিত হয়, এবং তার পরদিনই একুয়েরিয়াম থেকে লাফ দিয়ে বের হয়ে যায়। ক্লাসময় বিশ-পঁচিশটা ছোট সাইজের ব্যাঙ লাফালাফি করছি, আর আমরা, টিচাররা, এবং সিকিউরিটির কেউ একটা হৈচৈ করতে করতে তাদেরকে ধরার চেষ্টা করছি – সেই অপূর্ব সিনটা আরো অনেকদিন আমার মনে গেঁথে থাকবে।

স্মৃতির কুয়ায় ব্যাঙ হয়ে থাকতে তো ইচ্ছে করতেই পারে – তাই না?


সময়স্বল্পতা সত্ত্বেও নেহাল-শিবলী মিলে ঠিক করলো, আমাকে ব্রেক ড্যান্সিং শেখাবে।

আমি বললাম, ‘But I’m going away to Bangladesh soon. I won’t have time to learn properly.’

ওরা আমাকে আশ্বস্ত করলো, জিনিসটা খুবই সহজ – এবং যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য অত্যাবশ্যক। তাছাড়া, বাংলাদেশে ফিরে আমি নিজে নিজে প্র্যাকটিস করে ইমপ্রুভ পারবো।

শিবলী স্বপ্ন দেখালো, ‘Maybe you can teach your brother or sister how to break dance!’

‘You mean my brother.’

‘Yeah!’

চিন্তা করে দেখলাম, বুদ্ধিটা খারাপ না। আর এমনিতেও আমি শুধু বইপত্রের মধ্যে ডুবে থাকি, হাত-পা নড়াচড়া কম হয়। বেসিক কিছু নাচ দেখিয়ে-টেখিয়ে শিবলী হঠাৎ কার্পেটে মাথা দিয়ে লাটিমের মতো বনবন করে শরীর ঘোরানো শুরু করলো।

আমি তো মুগ্ধ – এ কেমন মায়া? নাচ জিনিসটাও এত কুল হতে পারে!

সঙ্গে সঙ্গে নিজেই জিনিসটা ট্রাই করতে গেলাম, এবং ঘাড় মচকে কান্নাকাটি করে বাসায় ফিরলাম।


একদিন সাত্তার আন্টি রিফাকে নিয়ে উপরতলায় হাজির। আমাকে দেখে হাসিমুখ বললেন তাদের সাথে ব্যাকইয়ার্ডে যেতে।

ঘটনা কি?

ঘাসের সমুদ্রে দাঁড়িয়ে জানতে পারলাম, রিফা আমার সাথে ট্রি-হাউজ শেয়ার করতে রাজি হয়েছে। আন্টি যুদ্ধজয়ের হাসি দিয়ে আমার দিকে তাকালেন। রিফা পাথরের মতো চোখ করে ফ্রান্সের বর্ডারের ডিরেকশনে তাকায়।

আনন্দে আমি প্রায় হার্টফেল করতে যাচ্ছি, এমন সময় রিফার কথা ভেবে আমার মন খারাপ হয়ে যায় – বেচারা এতদিন তার ট্রি-হাউজটা আগলে রেখেছে। দুই দিন পর তো আমি চলেই যাচ্ছি, তাছাড়া নেহালের সাথে তো ট্রি-হাউজটায় উঠেছি একবার।

তাই আন্টিকে বললাম, ‘It’s okay, I don’t want to anymore.’

আমার কথায় সাত্তার আন্টি এবং রিফা দুজনই হতভম্ব। কয়েকে সেকেন্ড পর আন্টি আহত গলায় বললেন, বহু কষ্টে তিনি মেয়েকে রাজি করিয়েছেন, আর এতদিন তো ট্রি-হাউজটার প্রতি আমার আকর্ষণ ছিল…

আমি বললাম, থ্যাংক ইউ, কিন্তু আমার আর ট্রি-হাউজে উঠতে ইচ্ছে করছে না। আন্টির সন্দেহ তখন পড়লো রিফার উপর – সিলেটি ভাষায় ঝাড়ি মারতে মারতে মেয়েকে নিয়ে বাসায় ফিরলেন।

তার কয়েকদিন পর আমি একা একা ব্যাকইয়ার্ডে গেলাম। তারপর একটা চেয়ার জোগাড় করে সেটার উপরে দাঁড়িয়ে ট্রি-হাউজের সিঁড়ি বেয়ে উঠলাম। এক মিনিটের মধ্যেই শুনি, কেউ একটা সিঁড়ি বেয়ে আসছে।

রিফা।

আমি গম্ভীরভাবে ব্যাকইয়ার্ডের একদিকে তাকিয়ে থাকলাম, আর সে আরেকদিকে। একটুপরে রিফা ভদ্রতার খাতিরে বললো, ‘The weather’s getting nicer.’

আমিও সায় দিলাম, আবহাওয়াবিষয়ক এক-দুইটা কথা বললাম। ব্যস, ঐটুকুই।

যাকে বলে a very British conversation.


চলে আসার দিন শিবলী তার অনেক শখের Asterix and the Soothsayer কমিক্সটা আমার হাতে গুঁজে দিয়ে বলে, ‘Don’t forget to put it in your suitcase!’

আমি মাথা নাড়ি।

বাসায় গিয়ে দেখি, বাবা-মা তাড়াহুড়া করে শেষ মুহূর্তের গোছগাছ করছে।

বইটা বুকে চেপে আমি কয়েক মিনিট কিংবা অনন্তকাল আমার বিছানায় বসে থাকি। সত্যি সত্যি তাহলে আমরা চলে যাচ্ছি? কেমন জায়গা, সেই বাংলাদেশ? আর কোনদিন কি আমার স্কুলের বন্ধুদের সাথে, নেহাল-শিবলীদের সাথে দেখা হবে?

অনন্তকাল বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না, বাবা এসে তাড়া দেয় – ‘ড্যাডি উঠ উঠ, দেরি হয়ে যাচ্ছে!’

ঘোর ভেঙে আমি ছুটে গিয়ে বইটা একটা সুটকেসে গুঁজে দিই। একটুপর আমরা শেষবারের মতো বাসাটার সিঁড়িগুলো দিয়ে নামি।

দরজার বাইরে সাত্তার ফ্যামিলির প্রায় সবাই। আন্টি আমার হাতে একটা ঘড়ি পড়িয়ে দেন – টম এন্ড জেরি’র একটা হাতঘড়ি। শিবলী, নেহাল, ফাতিমা হাসিমুখে আশ্বাস দেয়, আবার দেখা হবে, বাংলাদেশ তো কাছেই… কিন্তু রিফা কোথায়?

আন্টি বলা শুরু করলেন, রিফা বাসায়, কিছুতেই আসলো না, এত্ত শয়তান মাইয়া…

গাড়ি চলে আসে। লাগেজ ঢোকানোর সংগ্রাম শুরু হয়। হঠাৎ আমি দেখি, নিচতলার জানালার পর্দার ফাঁক দিয়ে এক জোড়া চোখ জ্বলজ্বল করছে।

আমাদেরকে নিয়ে গাড়িটা চলা শুরু করলে চোখদুটো ছুটে বাইরে এসে অন্যদের সাথে হাত নেড়ে গুডবাই দেয়। আমি জ্বীনের মতো পিছুমুখি হয়ে প্রাণপণে হাত নাড়তে থাকি।

একসময় আংকেল-আন্টি আর আমার বন্ধুরা ছোট হতে হতে লন্ডনের কোথাও একটা মিলিয়ে যায়। পাশের সিটে আমার মা বারবার চোখ মোছে। বাবা ড্রাইভারের সাথে ট্রাফিকবিষয়ক আলাপ-আলোচনা করে। আমি মন খারাপ করে আকাশ দেখি।

আর তখন, ঠিক ঐ মুহূর্তে, একটু একটু করে আমরা আবার বাংলাদেশি হওয়া শুরু করি।

[ চলবে ]

সেই চেনামুখ · ২৪ পর্ব

সব পর্ব

এই লেখককে আরও পড়ুন