পর্ব ১৮
স্মৃতিচারণ · · ৮ মিনিটের পাঠ

অনেক বড় হয়ে যাওয়ার পরও মাঝেমাঝে স্বপ্নে দেখতাম, আমি নানুবাসার সেই বারান্দাটায় দাঁড়িয়ে আছি। হাল্কা বাতাস বয় – আমার মনোযোগ বাইরের পৃথিবীতে; আশেপাশে কনস্ট্রাকশন।
একটা ফেরিওয়ালা হাঁক ছেড়ে থেমে থেমে এগোয়। পথভোলা একটা রিকশা টুংটাং করতে করতে যায়। কখনো দৃশ্যগুলি সাদাকালো, কখনো রঙিন।
হঠাৎ বারান্দাটায় একটা লোমশ, বিভৎস প্রাণী আবির্ভূত হয়। ‘আবির্ভূত হয়’ বলছি কারণ এক সেকেন্ড আগেও সে ছিল না। হাত নেড়ে সে আমার দিকে আসতে থাকে। আমি অবাক হয়ে তাকে দেখি।
লম্বায় প্রাণীটা বড়জোর সাড়ে তিন ফুট হবে। মুখজুড়ে ঝকঝকে বিশাল সাদা দাঁত। পাশে এসে দাঁড়াতেই তার নিকষ কালো দেহের পেশীগুলি আমার চোখে পড়ে। চাইলে সে অনায়াসে আমার ঘাড় মটকে দিতে পারে। কিন্তু না, তার মুখে হাসি। আমার সাথে সে বন্ধুর মতো করে কথা বলে। আমি তার ভাষা বুঝি না, তাই হা করে তাকিয়ে থাকি। গড়গড় করে সে কথা বলেই যায়। স্বপ্নের মধ্যেই আমি ভাবতে থাকি, কে এটা? কী এটা? এই কি সেই অদৃশ্য সত্তা, যার সাথে বারান্দায় আমার দেখা হয়েছিল?
এমন সময় আমার ঘুম ভেঙে যায়।
বাস্তবে আর কখনো প্রাণীটার সাথে আমার দেখা হয়নি। কিন্তু রাক্ষসের সাথে, আনফরচুনেটলি, অনেক বারই হয়েছিল।
নানুবাসা ভেঙে নতুন হয়ে গেছে অনেক আগেই। সেই বারান্দাটা নাই, বারান্দায় বিচরণ করা মানুষ বা প্রাণীদের অনেকেই আর নাই। কানাগলিটার কংক্রিটের পোষাক বদলে গেছে – আগের বিল্ডিংগুলির জায়গায় এখন নতুন সব নতুন বাড়ি। জিওগ্রাফি এবং রক্ষণশীলতা দুই-ই বদলানো খুব কঠিন; শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত গলিটা তাই কানা-ই আছে, দুই চোখ মেলে নিজের বদ্ধ প্রান্তটা দিয়ে মেইনরোড আঁকড়ে ধরতে পারেনি।
এখনো কি গলির মুখে কারেন্টের খাম্বাটা আছে? খাম্বাটা দেখে মনে হতো, সে ইউক্যালিপটাস গাছ হওয়ার ভান ধরে আছে। এত সরু ছিল গলিটা – দুইটা রিকশা পর্যন্ত পাশাপাশি যেতে পারতো না। একটা গাড়ি আর একটা রিকশা যেতে গেলে সিচুয়েশন আরো খারাপ, ড্রাইভার-রিকশাঅলার গালাগালি মহল্লাজুড়ে প্রতিধ্বনিত হতো। আমি অবাক হয়ে দেখতাম, এই জাতীয় বচসায় সবসময় ড্রাইভারদেরই জয় হয়। পৃথিবী উল্টে গেলেও তারা নিজের গাড়ির আগে কোন রিকশাকে ঢুকতে বা বেরিয়ে যেতে দিতে নারাজ।
জায়গায় জায়গায় অনাবৃত ড্রেইন। সেই ড্রেইনের ঘোলাটে সবুজ পানিতে মশক-ভাষায় হাহাহিহি করতে করতে অ্যানোফিলিস মশারা ডিম পাড়ে। অনেক আগে কেউ একটা বোধহয় অ্যাকুয়ারিয়ামের গাপ্পি মাছ ঢাকার ড্রেনেজ সিস্টেমে ছেড়ে দিয়েছিল; মশার ডিম খাওয়ার লোভে তারা গন্ডায় গন্ডায় বংশবৃদ্ধি করে। ড্রেনের পানিতে মাছ আবিষ্কার করে আমি অবাক হয়ে যাই – এই মাছের ছবি আমি বইয়ের পাতায় দেখেছি, শৌখিন মানুষজনের বাড়ির অ্যাকুয়ারিয়ামে দেখেছি। এরা আমার নানুবাসার কানাগলিতে আসলো কিভাবে?
মাছের নামটা ঐ মুহূর্তে মনে পড়ছিল না, স্থানীয় একটা ছেলেকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এটা কি মাছ, জানো?’
সে উল্টা অবাক হয় – ‘ইখানে মাছ আইলো কৈত্থন?’
ড্রেনের গন্ধ উপেক্ষা করে আমরা বসে বসে অনেকক্ষণ মাছ দেখলাম। মনে হলো মাছগুলির বাবা, মা, ভাই, বোন নিয়ে জমজমাট ফ্যামিলি আছে। পরে মোজাম্মেলের কাছে জানতে পারি, এই মাছের স্থানীয় নাম ‘রংধনু মাছ’। ধরে নাকি খাওয়াও যায়। সে নিজেও নাকি অনেকবার খেয়েছে।
অবশ্য আমার সন্দেহ থেকেই যায় – মাঝেমধ্যে মোজাম্মেলটা চাপাবাজি করে।
মা তাশনুভাকে নিয়ে ব্যস্ত থাকতো, আর নানী তখনো রান্নাবান্না প্রভৃতি নিয়ে বেশ ইনভলভ্ড্ – তাই গ্রীন রোডে থাকার সময়টায় আমার দেখ-ভালের দায়িত্বে মূলত ছিল আমার খালা।
একদিন দুপুর বেলায় সে আমাকে ভাত খাইয়ে দিচ্ছে। যথারীতি আমি তিড়িংবিড়িং করছি বলে থালা হাতে আমার পিছন পিছন ঘুরছে। হঠাৎ রাস্তা থেকে একটা চিৎকার।
‘আল্লার ওয়াস্তে দুগ্গা ভাত দেবেন? বাড়িতে কেউ আছেন? আল্লাহ গো… আল্লার ওয়াস্তে দুগ্গা ভাত দেবেন?’
আমি ছুটে বারান্দায় যাই। দেখি, ছেঁড়া কাপড় পরা একটা অল্পবয়েসী লোক, ক্লান্তভাবে ডাকতে ডাকতে গলির ভেতর হাঁটছে। তার কথায় আঞ্চলিক টান; আমার গায়ে তখনো লন্ডনের গন্ধ – কী ঘটছে, ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না।
‘হিয়ামণি, what is he saying?’ আমি জিজ্ঞেস করি।
কতই বা বয়স লোকটার? চব্বিশ-পঁচিশ হবে হয়তো। আমার চেয়ে অনেক বড় হলেও বুড়া বলা যায় না। কিন্তু এই বয়সেই তার হাঁটার ভঙ্গিটা বুড়া মানুষের মতো। বা ফুটবল খেলায় গোল মিস করা খেলোয়াড় যেভাবে হাঁটে, অনেকটা সেরকম। ভরাট গলায় একটু পরপর শুধু ‘আল্লার ওয়াস্তে আমারে দুগ্গা ভাত দেবেন? মাগো…’ – যেন পৃথিবীর সবচেয়ে দুঃখী মানুষের গান।
‘ভিক্ষা করতেছে, বাবা। ভাত চায়,’ আমার খালা মন খারাপ করে বলে।
‘ভাত? Okay, আমার ভাতটা ওকে দিয়ে দাও।’
‘কিন্তু এটা তো তোমার লাঞ্চ, তোমাকে খেয়ে শেষ করতে হবে।’
‘আর খাবো না।’
‘এরকম করে না, খেয়ে নাও।’
আমি এক লোকমা গ্রহণ করি।
তখন হঠাৎ হিয়ামণি বলে – ‘তাশফীন, ভেতরে চলো, বারান্দায় খায় না!’
‘Why?’
‘লোকটা বদদোয়া দিতে পারে, তখন তোমার শরীর খারাপ করবে।’
‘বড্ডোয়া কী?’
‘মানে এমনিই, হয়তো তোমাকে খেতে দেখে লোকটার মন খারাপ হবে। ওর খিদা লাগছে তো, তাই।’
‘কিন্তু আমি তাকে দেখতে চাই। I like his singing.’
‘ভেতরে আসো। ভেতরে এসে খেতে হবে।’
‘কিন্ত –‘
‘না, ভেতরে আসতে হবে,’ হিয়ামণি একটু শক্ত করে বলে।
আমি বাধ্য ছেলের মতো তার পিছন পিছন হাঁটি। একটু পরে আমাকে খাওয়াতে খাওয়াতে সে হেসে ফেলে।
‘ফকিরের কথাকে বলে কিনা singing!’
বাড়ির গেটের কাছে ডেকে এনে লোকটাকে কয়েক মুঠো চাল আর এক গ্লাস পানি পাঠানো হয়। এই সুযোগে আমি আবার বারান্দায় ছুটে যাই। লোকটা ঢকঢক করে পানি খায়, কিন্তু চালটুকু নেয় না। রাগী রাগী চোখে উল্টা বলে, ‘চাল রান্ধার উপায় থাকলে কি এম্নে ভিক্ষা কৈরা বেড়াই?’
বলে চলে যায়। আমি ছুটে গিয়ে হিয়ামণিকে বলি – ‘বলছিলাম না, he wanted rice, not চাল!’
একদিন রাত তিনটার দিকে আমার ঘুম ভেঙে যায়। আর ঘুম আসার নাম নাই।
কিছুক্ষণ এপাশ-ওপাশ করে আমি মাকে ডাকি। ‘Mummy, mummy…. I can’t sleep.’
মা ঘুমঘুম গলায় বলে, ‘আব্বু ঐপাশ ফিরে শও, দেখবা ঘুম আসবে।’
‘I tried it already, it didn’t work.’
‘আবার ট্রাই করো। আচ্ছা মামির কাছে আসো। চোখ বন্ধ করো। এবার go to sleep.’
তাতেও লাভ হলো না। মা বুদ্ধি দিলো, ‘এক গ্লাস পানি খেয়ে শও। পিশু করবা?’
‘উঁ উ।’
‘আচ্ছা পানি খাও তাইলে। ঐ যে ড্রয়ারের উপর পানির গ্লাস।’
‘But I’m not thirsty.’
হাল ছেড়ে দিয়ে মা বাবাকে ডাকে, ‘অ্যাই, অ্যাই, দেখ তো ছেলের ঘুম আসতেছে না –‘
কিন্তু বাবা কঠিন নিদ্রাপ্রিয় লোক। উ-আঁ করে যথারীতি ঘুম।
‘কি আশ্চর্য একটা মানুষ! ঘুমালে আর কোন খবর নাই!’ গর্ভধারিনী ফোঁস করে উঠে। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে প্রস্তাব দেয়, ‘স্টোরি শুনবা?’
আমি সানন্দে রাজি হই। লন্ডনে মা-ই সাধারণত আমাকে গল্প পড়ে শোনাতো। আপাতত অবশ্য মৌখিক গল্পই শুনতে হবে, গল্পের বই খুঁজতে অন্য ঘরে যাওয়া যাবে না।
প্রথমে একটা, তারপর দুইটা, তারপর আরেকটা… ডজনখানেক গল্প শোনানোর পর মা টায়ার্ড হয়ে আমাকে ঘুমিয়ে পড়ার জন্য অনুনয়-বিনয় শুরু করে। কিন্তু সন্তানমাত্রই স্বার্থপর – আমি অবিচলভাবে বলি, আরো স্টোরি শুনতে থাকলে আমি শিওর ঘুমিয়ে পড়বো…
মা’র ধাক্কাধাক্কিতে বাবা মাছের মতো খাবি খেয়ে ঘুম ভেঙে বলে, ‘অ্যা? কী? কী হৈছে?’
একটু পর সে গল্প বলা শুরু করে – সমুদ্রে একটা ডলফিনের বাচ্চার দলছুট হয়ে অ্যাডভেঞ্চারে যাওয়ার গল্প। (কোন বিচিত্র কারণে বাবার বেশিরভাগ গল্পই ছিল সমুদ্রকেন্দ্রিক।) মা ক্লান্তভাবে ঘুমোয়।
মুশকিল হচ্ছে, বাবা গল্প বলায় খুব একটা সিরিয়াস না। প্রায়ই তাকে আমার ধাক্কাধাক্কি করে গল্পের পরবর্তী অংশ শুনতে হয়। একসময় বাবার ঘুম পুরাপুরি কেটে যায়। আমারও গল্পের ঘোর কেটে যায়। ফিকশন বাদ দিয়ে আমরা জাগতিক ব্যাপার-স্যাপার নিয়ে কথা বলে সময় কাটাই।
হঠাৎ বাবা বলে, ‘তুমি কখনো সূর্য ওঠা দেখছো?’
‘What?’
‘Sunrise. Have you ever seen the sun rise?’
‘No, I haven’t.’
‘চলো, আজকে আমরা সানরাইজ দেখি। এই যে দেখ, রাত কাটতে শুরু করছে।’
‘Ok.’
সূর্যোদয়ের অপেক্ষায় কিছুটা সময় পার হয়। জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকতে থাকতে একসময় আমি ঘুমে ঢলে পড়ি…
‘অ্যাই তাশফীন, দেখবা না? এখনি সূর্য উঠবে।’
‘But I’m sleepy.’
‘এতক্ষণ কষ্ট করে জেগে থেকে এখন সানরাইজ না দেখেই ঘুমায়ে পড়বা?’
অগত্যা আমি হাই তুলে উঠে বসি। তারপর বাপ-বেটা বারান্দায় যাই। হঠাৎ পাখির ডাক। তার পরপরই আযান। আমি অবাক হয়ে কিছু বলতে যাবো, এমন সময় দিনের প্রথম সূর্যকিরণে আমার চোখ ধাঁধিয়ে যায়। পাশ থেকে বাবা ঝলমল করতে করতে বলে, ‘দেখছ, কি সুন্দর! Isn’t it beautiful?’
আমি মাথা নেড়ে বুঝাই, হ্যা।
কে যেন আকাশটা আবির-রঙে লেপ্টে দেয়। দূর থেকে যানবাহনের শব্দ ভেসে আসে। V formation-এ একটা হাঁসের ঝাঁক উড়ে যায়। মেইন রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে ফেরিওয়ালারা হাঁক ছাড়ে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমরা সেই হাঁক শুনি।
আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো চারদিকে তাকাই। বিরাট একটা লাল চোখের মতো সূর্যও আমাকে দেখে। সবকিছু আলোকিত করে সেই দৃষ্টি সকাল আনে। জগতে প্রাণ সঞ্চার হয়। কী সুন্দর! কী রাজসিক! একটু পরই কেউ অফিসের দিকে ছুটবে, কেউ বা স্কুলের দিকে।
বিছানায় ফিরে ঘুমিয়ে পড়তে পড়তে আমি ভাবি – এজন্যই আগেকার দিনে মানুষ সূর্যের উপাসনা করতো।
আমাদের কাঁঠাল বাগানে ফেরার সময় হয়।
আমার পিচকি বোনকে আমি গভীর আগ্রহ নিয়ে বলি, ‘We’re going home today. Do you know what ‘home’ means?’
শুনে সে অন্যমনস্কভাবে হাত-পা ছোঁড়ে।
[ চলবে ]
