বাংলাপ্রিয়বিভাগ
সেই চেনামুখ · পর্ব ১৯

পর্ব ১৯

লেখার আকার

বাসায় ফেরার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে সবাই আমাদেরকে ছেঁকে ধরে। সবার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে আমার বোন।

“আসছো?”, “ফিরছো তোমরা?”, “দেখি তো বেবিটাকে!” ইত্যাদি শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা হওয়ার জোগাড়। আফটার অল, হওয়ার পর থেকেই তাশনুভা নানুবাড়িতে। এ বাসার কেউ তাকে নিয়ে খুব একটা সময় কাটানোর চান্স পায়নি।

তথাপি বাংলাদেশে ফেরার পর থেকে এই প্রথম আমি লাইমলাইটের বাইরে – আশ্চর্য একটা ফিলিং। যেন আমি এক ধাক্কায় আদরের কক্ষপথ থেকে কিছুটা ছিটকে গেছি। আমার এক মাস বয়েসী বোনের প্রতি আমি সূক্ষ্ম ঈর্ষা অনুভব করি।

অনেক পরে জানলাম, বাঙালি সমাজে বিয়ের পরে মেয়েদের পিতৃগৃহে সময় কাটাতে যাওয়ার ব্যাপারটার একটা নাম আছে – ‘নাইওর’। আমার মায়ের মুখে এই টার্মটা অবশ্য কখনো শুনিনি। আজকাল শব্দটা প্রায় শোনাই যায় না। আগেকার অনেক ইমোশনই এখন বেমানান।

আমাদের অভ্যর্থনায় সেইদিন দরজা পর্যন্ত এগিয়ে আসা মানুষদের লিস্টে অনুপস্থিত ছিল কেবল একজন – আমার দাদা। ঐ আমলে একটু দূরত্ব মেইনটেইন করে চলাটা মুরুব্বিদের প্রায় কর্তব্যের মধ্যে পড়তো। আমি দাদার বেডরুমে ঢুকতেই সে হাসিহাসি গলায় বলে উঠে, ‘কী, মিস্টার তাশফীন! আমাকে তো ভুলেই গেছেন!’ তারপর অনুবাদ করে: ‘You forgot all about me!’

পিতামহকে জড়িয়ে ধরে আশ্বস্ত করলাম, তাকে একদমই ভুলিনি।

‘Tell me what you did at your নানা’s house. Did you have a lot of fun?’

বললাম তাকে। নানাভাই যে আমাকে হাজার হাজার পিংপং বল না চাইতেই কিনে দিয়েছে, এই ব্যাপারটা বিশেষভাবে উল্লেখ করলাম।

‘Okay, I will buy you lots of ping-pong balls too.’

কিন্তু ঐ বলা পর্যন্তই – দাদা একটু কৃপণ টাইপের ছিল। তার চরিত্রের এই দিকটা নিয়ে অনুযোগ করলে সে গম্ভীরভাবে বুঝাতো, এটা তার কার্পণ্য না, মিতব্যয়িতা। লাইফে মিতব্যয়ী না হলে নাকি কিছুই হওয়া যায় না।

সেই সাথে প্রাসঙ্গিক কোটেশনও আমাদের উপরে ছেড়ে দিতো –

যে জন দিবসে মনের হরষে

জ্বালায় মোমের বাতি,

আশু গৃহে তার দেখিবে না আর

নিশীথে প্রদীপ ভাতি।


বাড়িতে আমার অন্য দাদা – কমল দাদা, ওরফে কে.ডি. – ঝলমল করতে করতে আমাকে সুধায়, ‘দো-দো-দোস্ত, মা-মা-মার্বেলগুলায় কাজ হৈছিলো?’

‘কিসের মার্বেল?’ দাদা কৌতূহলী হয়ে পাশ থেকে জিজ্ঞেস করে। আমার নানীর মতো সে-ও আমার যার-তার সাথে খেলাটা পছন্দ করে না।

‘Nothing,’ আমি তাড়াতাড়ি বলি।

কিন্তু কে.ডি.’র তোতলামোর ট্রেন ততক্ষণে স্টেশন ছেড়ে দিয়েছে – ‘আ-আ-আমি তো আরো কি-কি-কিনে দিতে চাইছিলাম, কি-কি-কিন্তু ব্যাটার কাছে আর ছি-ছি-ছিল না…’

আমি চোখ গরম করে তার দিকে তাকাই।

‘ব-ব-বল্লা না, কা-কা-কা-কাজ হৈছে নাকি হ-হ-হ…’

‘কিসের মার্বেল?’ এদিকে দাদার গলার ভলিউম বাড়তে থাকে।

‘না হয় নাই,’ আমি হাল ছেড়ে দিয়ে চুপচাপ বলি। আর কী বলা যায়? মার্বেলে পেয়েও তো মোজাম্মেল গুল্লি খেলায় খুব একটা উন্নতি করতে পারে নাই।

‘বলো কি? কা-কা-কা-কাজ হয় নাই?’ কে.ডি. বিচলিত হয়। আমার যে কোন ব্যাপারেই সে বিচলিত হয়। ‘ক্যান?’

আমি কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলি, ‘Because everybody isn’t good at playing গুল্লি।’

এই পর্যায়ে আমার দুই দাদারই চোখে ফ্ল্যাশব্যাক ঝিলিক দেয়। একটা বয়সে কমল দাদারও গুল্লি খেলার বাতিক ছিল। সেজন্য সে তার দুলাভাই ওরফে আমার দাদার কাছে ঝাড়িও কম খায় নাই। আমার মুখে ‘গুল্লি’ শব্দটা শুনে সেই দুলাভাই এখন স্লো মোশনে তার দিকে ঘুরে বসে, তারপর রিভলভারের নলের মতো দৃষ্টি তাক করে। মুহূর্তের মধ্যে কৈশোরে ফিরে গিয়ে কে.ডি. কাঁচুমাচু ভঙ্গিতে কি যেন বলতে যায়।

এমন সময়ে গুলিবর্ষণ – ‘তুই আবার গুল্লি খেলা শুরু করিছিস! তাও আবার এই বয়েসে, ছিঃ!’

‘দু-দু-দুলাভাই, আপনি বি-বি-বি…’

‘কী? কী দু, দু, দু করতেছিস? আমি কি কিছু বুঝি না? নিজের মাথা খায়ে আমার নাতিটারও মাথা খাইতেছিস!’

তিড়িং করে চেয়ার থেকে উঠে কে.ডি. বিনীতভাবে বোঝানোর চেষ্টা করে, গুল্লি খেলা তো সে কবেই ছেড়ে দিয়েছে, আমি যে গুল্লি খেলি এইটাই সে জানতো না। সাথে অপমানিত গলায় যোগ করে, ‘তা-তা-তাছাড়া নাতি তো আ-আ-আমারও…’

কিসের কি! আমার দাদার ধমকে ধরণী দ্বিধা হওয়ার জোগাড়।

আমি তাড়াতাড়ি দুই ইমোশনাল বৃদ্ধের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তাদেরকে ঠান্ডা করার চেষ্টা করলাম। মোজাম্মেলকে যে আমি গুল্লির ট্রেনিং দিচ্ছিলাম, সেই কথাও বলে ফেলি।

‘But why? Why do you have to teach Mozammel? বুয়ার ছেলেকে কি জন্যে মার্বেল খেলার ট্রেনিং দিতে হবে?’ আমার দাদা ফোঁস করে উঠে। ‘আমি কিন্তু তোমার বাবাকে বলে দিবো!’

আমি হতভম্ব হয়ে তার দিকে তাকাই – সে যে এরকম পল্টি মারতে পারে, আমার ধারণা ছিল না। এমন না যে এই তথ্য জেনে ফেললে বাবা আমাকে কিছু বলবে, তবু মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। মোজাম্মেলকে মার্বেল খেলা শিখানোর ব্যাপারটা আমার সিক্রেট। এটা আমি সবার সাথে শেয়ার করতে চাই না।

হঠাৎ কে.ডি.’র একটা হাত আমাকে জড়িয়ে ধরে। গভীর সমুদ্র থেকে সাঁতরে উঠা ডুবুরির মতো সে বুক চিতিয়ে বলে – ‘খবরদার! খবরদার দুলাভাই, আপনি এই কা-কা-কাজ করতে যাবেন না!’

এবার আমি হা করে লিকলিকে, তোতলা মানুষটাকে দেখি – তার চোখে আগুন। আশ্চর্য তো! কয়েক সেকেন্ড আগেই না সে টিনএজারদের মতো উশখুশ করছিল? আর এখন ঝাড়ি দিচ্ছে?

‘বাচ্চা মানুষ গুল্লি খে-খে-খেল্লে কী হয়? মার্বেল দিয়ে খেল্লেই কেউ খা-খা-খারাপ হয়ে যায় না-না-না। কেন আপনি শুধুশুধু আমাদের দাদুর মনে ক-ক-কষ্ট দিতেছেন?’

ব্যস ঐটুকুই, তার বেশি একটা কথাও না। আমি আবিষ্কার করি, আমার চোখ ভিজে গেছে। কে.ডি.’র চোখও ছলছল।

এক সেকেন্ডের দীর্ঘ নীরবতা। আমার দাদা লজ্জিত ভঙ্গিতে অন্যদিকে ফিরে দোয়া গঞ্জল আরশ পড়ার ভান করে। একটু পরে দোয়া গঞ্জল আরশের আড়াল থেকে ছোট্ট একটা শব্দ ভেসে আসে – ‘স্যরি।’

তারপর আবার সুর করে তেলাওয়াত।


কমল দাদাকে আমি খুব বেশিদিন কে.ডি. ডাকিনি।

ডাকটা তার পছন্দ ছিল যদিও। সে নিজে আমাকে সবসময় ‘দোস্ত’ বলেই সম্বোধন করতো, কালে-ভদ্রে ডাকতো ‘দাদা’। কিন্তু লাইফের আরো অনেক ব্যাপারের মতো নামের দিক দিয়েও মানুষটার কপাল খারাপ।

‘দোস্ত’ ডাকটা কমল দাদার উদ্ভাবন হলেও মাজন দাদা সেটা হাইজ্যাক করে ফেলে। শুধু তাই না, ব্যাপারটা অফিশিয়াল করতে মাজন দাদা দাদীকেও আমার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয় এভাবে – ‘এই দেখ, তোমার দোস্তানী!’

নিজের বড় ভাই বলে কমল দাদা তাকে কিছু বলতে পারেনি। কালক্রমে ‘দোস্ত’ বলতে আমি মাজন দাদাকেই বুঝি। অরিজিনাল দোস্তের সাথে আমার সম্পর্ক অবশ্য বন্ধুর মতোই ছিল – চান্স পেলেই একজন আরেকজনকে তুই-তোকারি করতাম। একজন আরেকজনের পিছে লেগে থাকতাম। আবার ঝগড়া লেগে গেলে হাতাহাতি-মারামারি করারও রেকর্ড আছে – নর্মাল দাদা-নাতি সম্পর্কে যেটা অচিন্ত্যনীয়।

লোকটার নিজের নাম কিন্তু খারাপ না, ‘কমল’। অসাধারণ না হলেও কাব্যিক একটা ভাব আছে। আমাদের বাসার যশোর-ফরিদপুরের ভাষার অপভ্রংশে সেই নাম হয়ে গেল ‘কোমল’। বেশিরভাগ মানুষ তাকে চিনতো ‘কোমল মামা’ হিসেবে – কারণ তার এক গাদা ভাগ্নে-ভাগ্নী ছিল। সেইসব ভাগ্নে-ভাগ্নীদের বন্ধুবান্ধব থেকে শুরু করে তার চেয়ে কমবয়েসী প্রায় সবাই তাকে ঐ নামেই ডাকতো।

আমি নিজের চোখে দেখেছি, মহল্লার ফেরিঅলারা, নাইট গার্ডরাও তাকে ডাকছে ‘কোমল মামা’।

তখন রেগে গিয়ে সে তাদেরকে বলতো – ‘অ্যাই আমারে স্যার ডাকবা, স্যা-স্যা-স্যার।’


সেই বিচিত্র মানুষটাকে একটা লেখায় ধারণ করা অসম্ভব। এখনো যখন তাকে নিয়ে ভাবি, মাঝে মাঝে বিশ্বাসই হতে চায় না যে এরকম গল্প-উপন্যাস মার্কা একটা মানুষকে কাছে পেয়েছিলাম।

কমল দাদার নানা দীর্ঘস্থায়ী অসুখ ছিল – তোতলামো, হজমের সমস্যা, বিচিত্র টাইপের এলার্জি, এইসব। খেয়েই তাকে বাথরুমে ছুটতে হতো। শারীরিকভাবে সে ছিল ফিট, কিন্তু খিটখিটে শুকনা। টিভিতে আফ্রিকার দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষদের যেমন দেখায়, ঐরকম।

বলা বাহুল্য, আমরা তার বাথরুমপ্রীতি নিয়ে সারাক্ষণ ঠাট্টা করতাম। সে নিজে অবশ্য তাতে একটুও মাইন্ড করতো না, আমাদের সাথে মিলে হাহাহিহি করতো। ইন আ সেন্স, সে কখনো কৈশোর পার করেনি। সারাজীবন মনে মনে টিনএজারই থেকে গেছে। সেটার ভালো দিক যেমন আছে, খারাপও কিছু আছে।

তবে তার বিরাট একটা গুণ ছিল – যেটা খুব, খুব কম মানুষের মধ্যে দেখা যায় – সেটা হচ্ছে গীবতে প্রচন্ড অনাগ্রহ। কমল দাদাকে আমি কখনো কারো সমালোচনা করতে শুনিনি। কারো ব্যবহারে মনে কষ্ট পেলেও সে কখনো কষ্টদাতার ব্যাপারে খারাপ কিছু বলতো না, বড়জোর আফসোস করে নিজের কপালকে দোষ দিতো। তার সামনে বসে অন্যরা কারো সমালোচনা করলেও সে তাতে অংশ নিতো না। বরং হেসে অন্য টপিকে চলে যেত।

এক কালে বিখ্যাত পোগোজ স্কুলে পড়লেও পড়ালেখার দিকে থেকে সদাহাস্য মানুষটা খুব একটা এগোয়নি। যৌবনের ফটোগ্রাফে সে সুদর্শন; স্টাইলিশও বলা চলে। পোগজের ক্রিকেট টিমে খেলতো, ওপেনিং ব্যাটসম্যান হিসেবে (এটা সত্যি কিনা, সেই ব্যাপারে অবশ্য শিওর হওয়া যায়নি)। সেই বয়স থেকেই ঠোঁটের উপর হাল্কা মোঁচ। কেন কে.ডি.’র পড়ালেখা হয়নি, তার পারিবারিক ব্যাখ্যা – সে আড্ডাবাজ পোলাপানের পাল্লায় পড়েছিল। স্কুল ফাঁকি দিয়ে তাশ পেটাতো, সারা শহর টোঁ টোঁ করে ঘুরে বেড়াতো। এসব করতে গিয়ে একাধিকবার দাদা-দীদার কাছে ধরাও খেয়েছে।

কিন্তু বড় হতে হতে আমার নিজের কাছে এই জাতীয় ব্যাখ্যা রিডিকুলাস মনে হয়েছে। ঢাকা শহরের পোলাপান স্কুল ফাঁকি দিয়ে আড্ডাবাজি করবে, এটাই স্বাভাবিক। আমি নিজেই ক্লাস এইটের পর হরহামেশা স্কুল পালিয়েছি। পুরা ইন্টার জীবনে ঢাকা কলেজে সব মিলিয়ে হয়তো দশটা ক্লাসও করিনি। শুধু আমি একা না, আমার ক্লাসের বেশিরভাগ ছেলেই তাই।

সবচেয়ে বড় কথা, বখাটে পোলাপানদের একটা অন্যরকম ধাঁত থাকে, যেটা বার্ধক্যেও চাপা দেয়া যায় না। ঐ জিনিসটা কমল দাদার একেবারেই ছিল না। আমার বদ্ধমূল ধারণা, পড়ালেখার ব্যাপারে মানুষটার অনীহা ছিল মেডিকাল কোন কারণে – যেটা ঐ আমলে diagnose করা হয় নাই।

ছোটবেলা থেকেই দেখতাম, সে কাগজের টুকরায় নোট লিখে রাখে। বাজারের লিস্ট, কিছু একটা করতে হবে সেই লিস্ট, কার সাথে কখন দেখা করতে হবে – ইত্যাদি। এগুলি সে সাধারণত লিখতো হাতের তালুর উপর রেখে, দ্রুতগতিতে। লিখেই ঠাস করে পকেটে ঢুকিয়ে ফেলতো। একদিন সে এভাবে কিছু একটা লিখছে। এমন সময় তার পকেট থেকে কয়েকটা কাগজের টুকরা পড়ে যায়।

আমি তখন এইট-নাইন কিছু একটায় পড়ি, পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম, সেগুলি উঠিয়ে দিতে গেলাম। হঠাৎ একটা কাগজে আমার চোখ আটকে গেল – শব্দগুলি ভুলভাল। কিন্তু সেটা নিছক বানান ভুল না। তাছাড়া, আমি জানি দাদা সেই শব্দগুলির বানান জানতো – নিতান্তই দৈনন্দিন কিছু শব্দ।

একেকটা শব্দের অক্ষর কেমন যেন ওলট-পালট। ‘চালকুমড়া’ লিখতে গিয়ে ‘চামকুলড়া’, ‘মতিঝিল’ লিখতে গিয়ে ‘মতিলিঝ’, এরকম। এমন কি একটা শব্দ শেষ হয়েছে হ্রস্ব ই-কার দিয়ে।

আমি হা করে লিস্টগুলি নেড়েচেড়ে দেখতে থাকি। এমন সময় কমল দাদা খপ করে আমার হাত থেকে সেগুলি কেড়ে নিয়ে রামঝাড়ি দেয় – ‘এগুলি নিতে গেছ কি জন্যে! জানো না পার্সোনাল জিনিস ধ-ধ-ধরতে হয় না?’ বলেই ঝড়ের গতিতে কেটে পড়ে।

আমি সেইদিনের আগে বা পরে কোনদিন তাকে এত রাগতে দেখিনি। মনে হচ্ছিল যেন আমি তার কলিজায় হাত দিয়ে ফেলেছি। অনেক বছর পরে আমি UBC’ত developmental disorder-এ আক্রান্ত বাচ্চাদের language patterns নিয়ে গবেষণা শুরু করি। তখন জানলাম, dyslexia জাতীয় কিছু কিছু অসুখের কারণে রোগীরা ঠিকমতো লিখতে পারে না। অক্ষরগুলি ওলটপালট হয়ে যায়।

সেরকম লেখার স্যাম্পল দেখে আমি হতভম্ব হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকি – কমল দাদার লিস্টগুলি দেখে একদিন যেভাবে তাকিয়ে ছিলাম।


টিনএজ বয়সে আমার ছবি তোলার ব্যাপারে প্রবল আপত্তি ছিল। ফটোগ্রাফে বা আয়নায় আমার নিজেকে দেখতে একেবারেই ভালো লাগতো না।

হয়তো সেই অভ্যাসের কারণেই কমল দাদার সাথে আমার ঠিকমতো কখনো ছবি তোলা হয় নাই। ইন ফ্যাক্ট, তার ভালো কোন ফটো আমার সংগ্রহেও নাই।

দাদা-নানা শ্রেণীর লোকজনের মধ্যে শেষ পর্যন্ত আমার নিজের দাদার সাথেই সবচেয়ে গভীর বন্ধুত্ব হয়। তার কারণটা খুব সাধারণ – প্রথম দেখাতেই বুঝে গিয়েছিলাম, সে একজন ইমিগ্র্যান্ট। আমার মন পড়ে থাকতো ইংল্যান্ডে, আর তার হৃদয়জুড়ে ছিল অবিভক্ত ইন্ডিয়া।

চলনে-বলনে দাদার মধ্যে সবসময় ব্রিটিশ আমল-সুলভ ফিটফাট ভাব থাকতো। ততদিনে অবশ্য সে রিটায়ার্ড। আমি দেশে ফেরার অনেকদিন পর্যন্ত সে আমার সাথে মূলত ইংরেজিতেই কথা বলতো। আবার বাসার মানুষজনকে ডাকাডাকি করতে গিয়ে প্রায়ই উর্দু বা হিন্দুতে হাঁক দিতো।

এই তিন ভাষার বাইরেও দাদা অহরহ ফার্সিতে এবং সংস্কৃতে বুলি আওড়াতো। নতুন নতুন ভাষা শুনে আমার তাজ্জব অবস্থা দেখে সে হেসে আবার সাধ্যমতো কথাগুলি ইংরেজিতে ভাবানুবাদ করে বলতো।

তখন পর্যন্ত মহল্লার পোলাপানের কাছে আমি ঠিক পাত্তা পাচ্ছিলাম না, আবার বাংলা বলাতেও পুরাপুরি কমফোর্টেবল না – তাই দাদার সাথে আমার কথোপকথনগুলি ছিল লাইফজ্যাকেটের মতো। একবার গল্প শুরু হয়ে গেলে ভাসতে ভাসতে ঘন্টার পর ঘন্টা কেটে যেত। আমাদের বেশিরভাগ গল্পের বিষয়বস্তু ছিল আমাদের পারিবারিক ইতিহাস, দাদার প্রি-পার্টিশন জীবন, ধর্ম, পুরাণ – এসব। দাদা আগ্রহভরে বলতো। আমি ততোধিক আগ্রহভরে শুনতাম। তারপর প্রশ্নের পর প্রশ্নে তাকে ব্যস্ত রাখতাম। তাতে সে কখনো বিরক্ত হতো না।

একদিন দাদাকে নানুবাসার বারান্দায় সেই অশরীরী অভিজ্ঞতার কথা বললাম। শুনে সে দোয়া পড়ে আমার গায়ে ফুঁ দিলো।

‘What did you just do?’ আমি সুধাই। ‘What were you saying before you blowed?’

সে ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করে। এক কথা, দুই কথায় আমরা পৌঁছে যাই আমাদের ফ্যামিলি হিস্ট্রির কথায়।

‘আমরা পীরবংশ। We come from a long line of pirs,’ দাদা বলে।

‘What’s a pir?’

‘Pir হচ্ছে… saint. হ্যা, saint-ই বলতে পারো। Holy men.’

‘How holy?’

সে হেসে বলে, ‘Very holy. Most holy. Our lineage goes back to a warrior who fought for the Prophet.’

‘Wow! Were our ancestors worshipped in churches?’

‘No, that’s for Christians. Pirs cannot be worshipped. It’s haram.’

তখন প্রায় ডিনারের সময় – আমার পেট চোঁ চোঁ করছিল। তাই হারাম জিনিসটা কী, সেই নিয়ে আর প্রশ্ন করলাম না।

খানিকক্ষণ পরে আমি শেয়ার করি, ‘Dada, sometimes my dreams come true.’

‘হুম।’

আমি ব্যাখ্যা করি, 'Like, I sometimes see a dream at night, and then later, it really happens.'

দাদা মাথা নাড়ে। ‘I’ve heard it happen before in my family. In our family.’

[ চলবে ]

সেই চেনামুখ · ২৪ পর্ব

সব পর্ব

এই লেখককে আরও পড়ুন