পর্ব ২১
স্মৃতিচারণ · · ৫ মিনিটের পাঠ

পৃথিবীতে অনেক ধরনের কষ্ট আছে। কিন্তু পাঁচ বছর বয়সে দুই বছর বয়েসী একটা বাচ্চার কাছে রেগুলার মার খেয়ে ভর্তা হয়ে যাওয়ার মতো যন্ত্রণা আর নাই।
আমার বেলায় সেই আক্রমণকারী ছিল আমার ফুফাতো বোন প্রভা। প্রভারা আমাদের উপরতলায় থাকতো। ঐ আমলে আমি ছিলাম লিকলিকে পাতলা, পাঁজড়ের সবগুলি হাড় আঙুল দিয়ে গুনে ফেলা যায়, আর সে ছিল গাবদু-গুব্দু টাইপ।
এমন না যে সে ঠিক ইচ্ছা করে আমার সাথে মারামারি করতো – দুই বছর বয়েসের একটা মানুষ আর কী-ই বা বোঝে? অনেক ক্ষেত্রেই সে নিতান্ত খুশি হয়ে হাত-পা ছোড়াছুড়ি করে আমাকে আহত করে ফেলতো।
কিন্তু ব্যথার কোন বয়স নাই, এবং দিনের শেষে ব্যথা ব্যথাই – তাই এক পর্যায়ে আমিও চেঁচামেচি করে ওকে ঠেলা-ধাক্কা দেয়া শুরু করে দিলাম। তাতে সবসময়ই ফল হতো উল্টা। প্রথমত, আমার নিজের মা এবং প্রভার মা’র কাছ থেকে ঝাড়ি খেতে হতো। তার একটু পরে প্রভা নিজেই ফোঁপাতে ফোঁপাতে আমার কাছে হাজির হতো – ভাবখানা এমন, তুই এটা করতে পারলি?
ওর কষ্টে তখন আমার নিজের চোখেই পানি চলে আসতো। আমি তাড়াতাড়ি ওকে জড়িয়ে ধরতাম। সেদিনের মতো মিলমিশ!
পরদিন আবার একই কাহিনী, সেইম টু সেইম।
খোক্কসের প্রভার বয়েসী একটা মেয়ে ছিল। ধরে নিই তার নাম আভা।
সময়ের সাথে সাথে সেই আভাকে সবাই ভুলে গেছে। হয়তো আভাও নিজেকে সেই অর্থে মনে রাখেনি।
ওর হাসিটা ছিল অসম্ভব মিষ্টি। যেরকম হাসিতে পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন মানুষের হৃদয়ের বরফ গলে যায়, একদম সেরকম। কিন্তু সেই মেয়েটাকেই সকাল-সন্ধ্যা তার মায়ের হাতে ভয়াবহ মার খেতে হতো। অন অ্যাভারেজ দিনে তিনবার। যেদিন সে একটু কম মার খেত, সেদিন একটু বেশি হাসিখুশি থাকতো। যেদিন কপাল খারাপ থাকতো, সেদিন এরকম হাসিখুশি থাকার পরও বেচারিকে মার খেয়ে ঘুমাতে যেতে হতো।
মার খেয়ে আভা চিৎকার করে কাঁদতো। দুই বছর বয়েসের বাচ্চাকে শাসনের নামে এই অত্যাচারটার তখনকার দিনে কোন নাম ছিল না। আজকাল আমরা এটাকে বলি শিশু নির্যাতন।
মনের আনন্দে আভা মাঝেমধ্যে কাগজে আঁকাআঁকি করতো। গভীর মনোযোগে কখনো কখনো জিভ কামড়ে পৃষ্ঠার দিকে তাকিয়ে থাকতো। স্ট্র্যাটেজিক কাজকর্মে সে বরাবরই ভালো – লেগো দিয়ে একটা কিছু বানাতে হবে? নো প্রবলেম। সোফার বালিশ স্তুপ করে ক্যাসল বানাতে হবে? এগুলি তার এক মিনিটের কাজ। দোলনায় চড়া বিষয়ক নতুন একটা খেলা উদ্ভাবন করতে হবে? অফ কোর্স।
সেরিলাক খাওয়ার বয়স থেকেই আভা স্পোর্টসে দারুণ। আরেকটু বড় হয়ে ছড়া লেখার চেষ্টা করতো। নার্সারি রাইমের ক্যাসেট বাজানো হলে মন দিয়ে শুনতো। একদিন কি সে বিখ্যাত কবি হতে পারবে? আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল।
কিন্তু সেই ভাবনাটা ভাবার সুযোগ সে খুব একটা পায়নি। এক বিকেলে আভার বাসায় গিয়ে দেখি, মার খেয়ে তার ডান চোখটায় কালশিটে পড়ে গেছে। তার ছড়ার খাতাটা ছিন্নভিন্ন হয়ে ডাস্টবিনে মুখ গুঁজে কাঁদছে।
গুটিগুটি পায়ে সময় এগিয়ে যায়।
কমল দাদা আমাকে চমকে দিয়ে একদিন বলে, ‘দোস্ত, স্যরি – তো-তোমাকে আমি তো ব-ব-বলতেই ভুলে গেছি এ-এ-একটা কথা…’
আমি লাঞ্চ খেয়ে হাত ধুচ্ছিলাম তখন। জানতে পারলাম, কিছুদিন আগে একটা বস্তির ছেলে আমার খোঁজে এসেছিল। দাদা তার নাম জিজ্ঞেস করেছিল, কিন্তু এখন সেটা তার মনে নাই।
আমি সঙ্গে সঙ্গে নিচে ছুটে যাই, যেন সময় জিনিসটা রিওয়াইন্ড করা যায়, এক্ষুনি গেটের কাছে গেলেই বন্ধুটাকে পাওয়া যাবে। কমল দাদাও আসে পিছু পিছু।
‘দোস্ত, ক-ক-কই যাও?’ সে অবাক হয়ে সুধায়।
আমার চোখে পানি চলে আসে, কিছু বলতে পারি না। আর কখনো কি কামালের সাথে, আমার গুল্লি খেলার বন্ধুদের সাথে আর দেখে হবে?
ইশ, এত অল্পের জন্য দেখা হলো না!
একদিন প্রভার সাথে সম্পর্ক খারাপ, তো আরেকদিন ভালো। আলটিমেটলি আমাদের বয়সের তফাৎটা একটু বেশি ছিল – তাই প্রায়ই ভুল বোঝাবুঝি হতো।
একবার মারামারি করতে গিয়ে ধাক্কা দিয়ে আমরা একটা গ্লাস ভেঙে ফেললাম। কার ধাক্কায় ভাঙলো গ্লাসটা, ঠিক শিওর না। বড়রা ছুটে এলো, ‘কী হৈছে? কী হৈছে?’
ভেবেছিলাম প্রভা আমাকে দোষ দিবে… যে কোন মুহূর্তে আমি ঝাড়ি খেতে যাচ্ছি… আতংকে আমি চোখ বন্ধ করে ফেলি… এমন সময় ওকে বলে উঠতে শুনি, ‘কিছু না, কিছু হয় নাই!’
আমি হা করে ওর দিকে তাকাই।
‘একটা বিড়াল এসে গ্লাস ভেঙে ফেলছে!’
উপস্থিত সবার অট্টহাসি শুনে বুঝি, আজকে আমরা কেউই ঝাড়ি খাচ্ছি না।
প্রভা আমার দিকে তাকিয়ে হাসে। আমিও হাসি।
(পরদিন আবার মারামারি।)
ক্যালেন্ডারের পাতাগুলি পুরানো হতে থাকে।
যে বাসায় ফ্যান না ছেড়ে থাকা যেত না, সেখানে আমি ঠান্ডায় ঠকঠক করে কাঁপি। বাংলাদেশে তো লন্ডনের মতো এত শীত পড়ে না, তাহলে কেন…?
‘এখানে লন্ডনের মতো হিটিং নাই তো, তাই,’ মা ব্যাখ্যা করে।
আমি আমার মেইন দাদার সাথে মাঝেমধ্যে কাঁঠাল বাগান বাজারে যাই। সে বাজার করতে খুব পছন্দ করে। প্রায়ই দরদাম করতে গিয়ে সে দোকানদারকে লাঠি উঁচিয়ে শাসায়। তাতে তারা একটুও ভয় পায় না, কিন্তু হাসিমুখে জিনিসের দাম কমায়।
আমার বোন হামাগুড়ি দেয়া শিখে ফেলে। আমি ইশারায় ইশারায় তার সাথে অনেক খেলা খেলি। জিভ দিয়ে ভেংচি কাটার খেলাটা আমাদের দুজনেরই খুব প্রিয়।
একদিন মা তাশনুভাকে খাওয়াতে যাবে, কিন্তু সে কিছুতেই খাবে না। চামচটা তার মুখের ধরলেই জিভ বের করে ভেংচি কাটে। কি কিউট – কিন্তু একই সাথে, কি মুশকিল!
মা কপট রাগ দেখিয়ে আমাকে বলে, ‘আব্বু, দেখছ তোমার সিস্টার কত পাজি হয়ে গেছে – ওকে পিট্টি দিতে হবে।’
তখনো আমি কপটতা খুব একটা বুঝি না (এখনো যে বুঝি, তাও না)। আমি আতংকিত হয়ে বললাম, ‘Why mommy?’
‘এই যে দেখো না, মামির কথা শুনতেছে না। পিট্টি দিতে হবে না?’
বলে সে হাত উঁচিয়ে ধরে।
আমার মধ্যে সঙ্গে সঙ্গে কি যেন হয়ে যায় – আমি আমার বোনকে জড়িয়ে ধরে বলি, ‘Please don’t hit her, mommy! তুমি ওকে মেরো না, আমাকে মারো! ও তো little!’
হাসতে হাসতে মা’র চোখে পানি চলে আসে। আমিও বুঝতে পারি, এতক্ষণ সে জোক করছিল।
কি আশ্চর্য, আমি মনে মনে ভাবি, এই আমি-ই কি লন্ডনে মেয়েদের সাথে দশ হাত দূরত্ব মেইনটেইন করে চলতাম?
অনেকদিন পর আলেকজান্দ্রিয়ার চেহারাটা মনে পড়ে গেল।
[ চলবে ]