বাংলাপ্রিয়বিভাগ
মানুষ ও উপলক্ষ

আমার বাতিঘর

লেখার আকার

একটা বয়সে নাটক-সিনেমায় ভালোবাসার ভাব-সাব দেখে মুগ্ধ হতাম। কত সুখীই না মানুষ হতে পারে!

গায়ে বাতাস লাগিয়ে ঘোরাফেরা করা, একসাথে ফাস্টফুড খেতে খেতে খিটিমিটি করা, মাঞ্জা মেরে টনি ডায়েসের মতো উদাস চোখে শপিং করা – এর চেয়ে ভালো থাকা সম্ভব নাকি? ভুল বোঝাবুঝি, ট্র্যাজেডি, পাড়ার মাস্তান যে থাকে না তা না। কিন্তু প্রথম থেকেই ঘটনা পরিষ্কার, ভিলেন যেই হোক, যাই হোক, তার কোন বেল নাই।

রিয়েল লাইফ ঐরকম হয় না। বা হলেও সেটা সাময়িক, নায়ক-নায়িকা দুই দিনেই সুরসুর করে লাইনে চলে আসে। কারণ বাস্তবে ঝড়-ঝাপ্টা অনেক বেশি। ইচ্ছা করলেই বিজ্ঞাপন বিরতির পর গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ানো যায় না। মনের কষ্ট মুছতে সময় লাগে, শক্তি লাগে। সিরিয়ালের দুষ্ট লোকের কপালে শেষ পর্যন্ত দুঃখ থাকলেও বাস্তবে সেরকম হয় না। কিছু কিছু ক্ষতির কখনোই ক্ষতিপূরণ হয় না।তার উপরে রিয়েল লাইফে নাটক-সিনেমার তুলনায় প্রজননবিশারদ অনেক বেশি। সমস্যা থাকুক আর না থাকুক, তারা তাদের জ্ঞান জাহির করেই ছাড়বে। বেশিরভাগই আবার ডায়াগনসিস আপনাকে সরাসরি বলবে না, বলবে আপনার কাছের মানুষকে।

নাটক-সিনেমার ভালোবাসা যদি হয় পুকুরে পা ডুবিয়ে বসে থাকা, তাহলে বাস্তবের ভালোবাসা হচ্ছে মাঝ-সমুদ্রে সাঁতার কাটা।

আপনার চারদিকে শেয়ার বাজার ধসে পড়তে থাকবে। মন খারাপ হবে। জিনিসপত্রের দাম বাড়তে থাকবে। আবার মিলমিশ হবে। বন পুড়ে কয়লা হবে। চাকরি বদলে অন্য চাকরি হবে। জমির দাম আকাশে গিয়ে ঠেকবে। আশা, হতাশা আর আশাভঙ্গের তাশ খেলা চলতেই থাকবে। ফ্যামিলির জনসংখ্যা কমবে, আবার বাড়বে।

জীবনটা সরল না। একেবারেই না।

প্রায়ই আপনার মনে হবে, এসব করে কী লাভ? লাভ কী? আপনি জানেন না। তবু সাঁতার কাটতে থাকবেন। নিজের স্বার্থেই কাটবেন, কারণ রিয়েল লাইফে আনন্দ, প্রাপ্তি, শান্তি – সেগুলিও অনেক বেশি। এতই বেশি যে ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। দুঃখের অনেক সমার্থক শব্দ হয়। বিরহ, বিষাদ, আরো কত কি। ভালো ফিলিংগুলির জন্য ঐ টাইপ শব্দ কিন্তু নাই। কারণ ভালো সময় স্বপ্নের মতো কাটে, শব্দ উদ্ভাবনের কথা মাথায় আসে না।

জীবনের বেশিরভাগ সময়ই ভালো সময়।

সাঁতার কাটতে কাটতে আপনি সমুদ্রকে বলবেন, চলো বাতিঘর দেখে আসি।

সমুদ্র বলবে, বাতিঘর দেখতেই তো যাচ্ছিলাম, যাচ্ছিলাম না?

তার অনেক দিন পর আপনি একদিন বারান্দায় খবরের কাগজ পড়তে বসবেন। কোন অদ্ভুত কারনে সেদিন আপনার পরনে থাকবে সাদা পাঞ্জাবি-পায়জামা। কাঁচা-পাকা চুল ছুঁয়ে নাকের উপর সোনালি ফ্রেমের পুরানো চশমা চোখ বুলাবে স্পোর্টসের পাতায়। আপনাদের একতলা বাসাটার টিনের চালে বৃষ্টি পড়তে থাকবে। আষাঢ়ের তেজস্বিনী ধারাপাত না, পৌষ মাসের অসময়ের চিপা বৃষ্টি। এক কাপ চা পেলে মন্দ হতো না।

কোত্থেকে যেন একটা আন্ডাবাচ্চা খিলখিল করতে করতে দৌড়ে এসে হুমড়ি খেয়ে আপনার উপরে এসে পড়বে। খবরের কাগজটা ছিঁড়ে যাবে। আপনি যতই তার উপর রাগ করবেন সে ততই হাসবে, একটুও ভয় পাবে না।

বাড়ির ভেতরে বৃদ্ধ বাবা-মা চানাচুর দিয়ে মুড়ি-মাখানো খেতে খেতে সুখ-দুঃখের গল্প করছেন। শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে আপনার শ্বশুর-শ্বাশুড়িও একই ছাদের নিচে বাস করছেন। কিছুক্ষণ আগে কই যেন বেড়াতে গেলেন। কাছের মানুষরা একই মহল্লায় থাকেন, নয়তো পাশের কোন গ্রামে।

আন্ডাবাচ্চাকে আপনি কপট রাগ দেখিয়ে বলবেন, ভাগ এখান থেকে!

সেও দাঁত বের করে আপনাকে বলবে, ভাগ এখান থেকে! তারপর দৌড়ে পালিয়ে যাবে।

ভেতর থেকে প্রিয় একটা কন্ঠ ভেসে আসবে – চা খাবা?

আপনি বলবেন, দাও এক কাপ।

এক মুহূর্ত পর কন্ঠটা বলবে, আমি তো ভাবসিলাম তুমি চা বানায়ে আমাকে খাওয়াবা।

আমি?

বাহ, সারাজীবন রান্না করে খাওয়ালাম, এক কাপ চাও খাওয়াইতে পারবা না?

উঠান পেরিয়ে আপনি রঙ্গন গাছটার পাশ দিয়ে হেশেলঘরে এসে ঢুকবেন। কাঠের চুলোয় চায়ের পানি চড়াতে না চড়াতেই প্রিয় মানুষটা এসে হাজির হবে।

এসেই বলবে, ভাগ্যিস আসছিলাম, নাইলে তো এক গাদা চা নষ্ট করতা! দাও আমিই বানাচ্ছি!

মনে মনে খুশি হলেও মুখে গজগজ করতে করতে আপনি বারান্দার ইজি চেয়ারটায় এসে বসবেন। ছেঁড়া খবরের কাগজটায় বঙ্গোপসাগর নিয়ে কি-একটা হেডলাইন দেখে মনে পড়ে যাবে বহুদিন আগের সমুদ্র-স্মৃতি…


গতকাল ছিল আমাদের বিয়ের একাদশ বার্ষিকী। যথারীতি আমি Tina Shahrin Khanকে উইশ করতে ভুলে গেছি।

তবু বাকি জীবনটা তার সাথে বাতিঘর খুঁজে কাটিয়ে দেয়ার আশা রাখি।

বিঃদ্রঃ সাধারণত আমাদের বিশেষ দিনগুলিতে টিনা ভালো-মন্দ রান্না করে। কিন্তু এবার সপরিবারে জ্বরগ্রস্ত হওয়ায় রাতের মেনু ছিল শুধু চপ আর (আমার জীবনে খাওয়া বেস্ট) চিকেন তেহারি।

এই লেখককে আরও পড়ুন