বাংলাপ্রিয়বিভাগ
মানুষ ও উপলক্ষ

যদি তুমি ভয় পাও

লেখার আকার

অনেকদিন ধরেই ভাবছিলাম লেখালেখি ছেড়ে দেব। ক্ষণিকের চিন্তা না, একদম সিরিয়াস।

এমন একটা ভাবনা যে আমার জন্য কতখানি কষ্টের, সেটা আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না। ছোটবেলা থেকে প্রায়ই আমি একটা স্বপ্ন দেখি – একটা ছোট্ট ঘরে আমি টেবিল-চেয়ারে বসে লিখছি। আমার বয়স সাত কিংবা আট, পরনে স্যান্ডো গেঞ্জি আর হাফপ্যান্ট। মাথার উপরে সিলিং ফ্যানটা কাজ করছে না মনে হয়। গাঢ় সবুজ টেবিলক্লথের উপর একটা সস্তা কিন্তু মজবুত টাইপের টেবিলফ্যান প্রাণপণে ঘুরছে (স্টেডিয়াম মার্কেটে আগে যেমনটা পাওয়া যেত)। আমার চেয়ারটার পেছনে বইয়ের র‌্যাক, ফার্নিচার। একটা বড় জানালা দিয়ে দিনের আলো ঢুকছে।

কয়টা বাজে? সকাল এগারোটা? বারোটা?

সবকিছু উজ্জ্বল, সবকিছু শুভ্র।

উত্তাল বাতাসের ধাক্কায় আমার খাতার পৃষ্ঠাগুলো কালবোশেখির মতো দুলতে থাকে। আমার সেদিকে খেয়াল নেই। ঝড়কে আমি আটকে রেখেছি এক হাত দিয়ে, আরেক হাত দিয়ে লিখছি। খাতার কভারটা টকটকে লাল।

একসময় ঘুম ভেঙে যায়। বছরের পর বছর আমি একই দৃশ্য দেখে আসছি। স্বপ্নে আমি অসাধারণ সব লাইন লিখি যেগুলি ঘুম থেকে উঠলে আর মনে থাকে না। বাস্তবের আমি বুড়িয়ে চলি, কিন্তু স্বপ্নে আমার বয়স বাড়ে না।

অদ্‌ভুত একটা স্বর্গে বসে আমি শুধু একমনে লিখতে থাকি।

স্বর্গের সাথে মাটির পৃথিবীর ভীষণ অমিল। এখানে সবসময় পরীক্ষা দিয়ে পাস করতে হয় – কখনো কলেজে, কখনো সম্পর্কে, কখনো আবার বিদেশের নাগরিকত্ব চাইতে গিয়ে। সবচেয়ে বেশি পরীক্ষা দিতে হয় নিজের কাছে – দ্বিধার চেয়ে বড় শয়তানের সাথে আমার আজ অবধি দেখা হয়নি।

তার উপর আমার মাথায় যেসব কাহিনীগুলি ঘুরপাক খায় সেগুলিকে ঠিক গতানুগতিক টাইপের না। আমার উপন্যাসের যুবকরা পায়ে হেঁটে অতীতে যায়, হাঁটতে হাঁটতে কখনো কাক হয়ে আকাশে উড়ে। বুকের খাঁজে চাকু গুঁজে যুবতীরা বনলতা সেনের মতো হাসে। মানুষের কষ্ট দেখে রাজবাড়ি নামের আটপৌরে একটা শহরে আশ্বিনী ঝড় বয়ে যায়, প্রতিবাদী হাস্নাহেনারা তবু জীবন বাজি রেখে ফোটে, সব কষ্টকে সুগন্ধ দিয়ে ডুবিয়ে দিতে চায় বলে…

আমার গল্পের বুড়ো মুক্তিযোদ্ধা ষোলই ডিসেম্বরের পর তার স্টেইনগানটা ফেরত দেয়নি, কখনো দেবেও না; রাত জেগে সে আজও গ্রাম পাহারা দেয়, কারণ মানুষের মুক্তির যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি, হয়তো হবেও না… তাদের সাথে তাল মিলিয়ে শিশু চরিত্রগুলিও স্ফুলিঙ্গের মতো। তারা অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পিছুপা হয় না, কঠিন কঠিন প্রশ্ন করতে ভয় পায় না। সাঁতার জানা না থাকলেও তারা মাতৃভূমির জিয়নকাঠির খোঁজে তালপুকুরে ঝাপ দিতে একটুও দেরি করে না।

(আচ্ছা, স্বাধীনতা জিনিসটা আসলে কী? স্বাধীনতার পক্ষ-অপক্ষ কী; সেটার আবার ঘোষক লাগে নাকি? দেশকে, স্বাধীনতাকে ভালোবাসার তো কোন বয়স নাই; জীবন একটাই, প্রাণের সোর্সও একটাই; কাজেই, আপনার-আমার মনে যে মারফতি তত্ত্বগুলি খাবি খায়, সেগুলি যে নবীনতর মস্তিষ্কে আরো বিশুদ্ধ আকারে ধরা দেবে – তাতে বিস্ময় কী?)

হয়তো আমার নির্বুদ্ধিতা, হয়তো আমার ইগো বা স্বার্থপরতা – কখনো ভাবিনি, আমাদের প্যাকেজ নাটকের দেশে এই সব নতুন নতুন গল্প লেখার কোন কারণ থাকতে পারে। কখনো ভাবিনি, এক চিমটি রবীন্দ্রনাথ, এক মুঠো সুড়সুড়ি, আর এক লিটার মধ্যবিত্ত সমাজের প্যানপ্যানানির বাঙলা সাহিত্যের দেশে একদিন নতুন কিছু ঘটতে পারে।

আসলে কখনো ভাবিনি, আমরা বদলাতে পারি।

তাই ঐসব গল্প পাঁজরের ভেতরে টাইট করে এতদিন আটকে রেখেছিলাম। অনেকদিন ধরে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি নিয়ে একটা উপন্যাস লিখছি, সেটাও লেখা বন্ধ করে দিয়েছিলাম।

কিন্তু কিছুদিন আগে বাংলাদেশে যে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনটা হয়ে গেলো, সেটা ভূমিকম্পের মতো সবকিছু এলোমেলো করে দিলো। বিস্ময়, আনন্দ, উৎকন্ঠা আর উত্তেজনা নিয়ে আমি আবিষ্কার করলাম, আমার মাথার ভেতর যেই সংশপ্তকরা দিনরাত বিচরণ করে, তাদেরই মতো বা তাদের চেয়ে সাহসী ছেলেমেয়েরা স্বাভাবিক মৃত্যুর দাবিতে মিছিল করছে, ধানমন্ডিতে, মিরপুরে, বগুড়ায়, খুলনায়…

তারা সমাবেশ করে, শিহরণ-জাগানো স্লোগান দেয়, আবার মাথা ঠান্ডা রেখে নিজের অবস্থানে অটল থাকে। শুধু তাই না, দিন শেষে এরা রাস্তা পরিষ্কার করে দিয়ে যায়! কারা এই বিস্ময়-মানুষ? কোত্থেকে এলো? যাদেরকে আমি কল্পনায় ঠাঁই দিতেই ভয় পেতাম, সৃষ্টিকর্তা তাদেরকেই কিনা ঢাকা শহরের রাজপথে নামিয়ে দিলেন!

তাই আমার সব গল্প তাদের জন্য।

আমার স্বর্গ আর পৃথিবী তাদের জন্য।

(যদিও আমি ভালো করেই জানি, তাদের প্রজন্ম আমার মতো পাতি লেখকদের চেয়ে অনেক সুন্দরভাবে বাংলা সাহিত্যকে এগিয়ে নিতে পারবে।)

যারা এখনো ভাবছেন, কই, আন্দোলন তো থেমেই গেলো! এত ফালাফালি করে তো যেই লাউ সেই কদু? তাদের জন্য আমার বিনীত পরামর্শ – শিকড় পাল্টে গেলে উদ্ভিদেরও সেটা বুঝে উঠতে কিছুটা সময় লাগে, আর বাঙালি তো জাতেই আবাল। ভাষা আন্দোলনের পরও অনেকে বুঝতে পারেনি, বিশাল একটা কিছু ঘটে গেছে। তারপর মাত্র উনিশটা বছরে যা ঘটলো, আগামী উনিশ হাজার বছরেও কেউ সেটা ভুলতে পারবে না। আর কোনদিন কেউ স্বপ্নেও কারো মুখের ভাষা কেড়ে নেয়ার দুঃসাহস দেখাতে যাবে না।

কাজেই, ধৈর্য ধরুন। বাংলাদেশের রাজনীতির শেকড় পাল্টে গেছে, রেডি থাকুন। অভিমানী গার্লফ্রেন্ডকে চিঠি লেখার মতো করে যে বুদ্ধিজীবীরা আন্দোলন বিষয়ক কলাম লিখলেন, চাইলে তাদের সাথে চা খেয়ে ঠান্ডা হতে পারেন।

আপাতত ভেবে দেখুন, সামনের ইলেকশনে প্রার্থীদের কী টেনশন! দল-মত নির্বিশেষে সারাক্ষণ তাদের মাথায় ঘুরতে থাকবে, কোনদিন কেউ না কেউ বলে উঠবে – এই চ্যাটের বাল কি ক্লাস সেভেন-এইটের পোলাপানের চেয়ে ভালো দেশ চালাতে পারবে?

এবং তার পরের ইলেকশনে…

এবং তার পরেরটায়…

একই ধরনের টেনশন এখন ট্রাফিক পুলিশের, বাস ড্রাইভারের, শ্রমিকের, কর্মকর্তার, শিক্ষকের, এমনকি সাংবাদিকের।

তাই একদিন অবধারিতভাবে সব ঠিক হয়ে যাবে। সেই দিনটা যতটা দূরে ভাবছেন, তত দূরে না। জুলাই মাসের শুরুতেই কে ভেবেছিল, শিশু-কিশোরদের অহিংস পদযাত্রায় সারা দেশ প্রকম্পিত হবে?

যে দেশে মঙ্গলপ্রদীপ স্কুলের ইউনিফর্মে দাউদাউ করে জ্বলে, সেই দেশকে কে ঠেকিয়ে রাখতে পারে?


যদি তুমি ভয় পাও তবে তুমি শেষ

যদি তুমি রুখে দাঁড়াও তবে তুমি বাংলাদেশ

এই লেখককে আরও পড়ুন