বাংলাপ্রিয়বিভাগ
গল্প

মিথিলা

লেখার আকার

ক্লাস এইটে থাকতে কয়েকশ’ মেয়ে আমার প্রেমে পড়েছিল। প্রতিদিন বৃত্তি কোচিং শেষে আমি আর ফটোকপির দোকানের পিচ্চি মিলে তাদের ইন্টারভিউ নিতাম।

‘ইন্টারভিউ’ বললে অবশ্য বেশি সিরিয়াস শোনায় – প্লাস্টিকের টুলে বসে আমি হাসি মুখে মেয়েগুলিকে কিছু সাধারণ প্রশ্ন করতাম, আর পিচ্চিটা (এখন যার নাম মনে পড়ছে না) উত্তরগুলি গম্ভীরভাবে একটা খাতায় লিখে রাখতো। কথাবার্তা শেষে পিচ্চি এক কাশি দিলে তার অর্থ, সে এই মেয়েকে আমার উপযুক্ত মনে করছে। আর দুই কাশি দিলে না, কোন ভাবেই না।

আমি অবশ্য হাঁচি-কাশি নির্বিশেষে সবাইকে বলতাম –

“অনেক থ্যান্ক ইউ আমার সাথে দেখা করার জন্য!”

“অ-নে-ক-দি-ন পর কারো সাথে মন খুলে কথা বললাম!”

“আরে, আমিও তো হুমায়ূন আহমেদের বিশাল ফ্যান! খুবই মিল তো আমাদের!”

“বিশ্বাসই হচ্ছে না আমাদের আগে কানেকশন হয় নাই!”

ইত্যাদি। খামাখা মার্কেট খারাপ করার কোন মানে হয় না।

সবশেষে পিচ্চিটা খুব প্রফেশনালি বলতো, “ঠিকাছে আপু, তিন-চাইর দিন পর এট্টু আমার কাছ থিকে মিটিংয়ের ব্যাপের খোঁজ নিয়ে যায়েন।” মিটিং মানে ডেটিং। সেই রমরমা যুগে আমি সপ্তাহে গড়ে উনিশটা মেয়ের সাথে মিটিং করতাম। যেসব দিনে স্কুল থাকতো আবার কোচিং-ও থাকতো, সেদিন দুই-তিনটা। শুধু স্কুল বা কোচিং থাকলে চার-ছয়টা।

শুক্রবারটা ফ্যামিলির জন্য ফ্রি রাখতাম। আর শনিবার যেহেতু নিজেই টিউশনি করতে যেতাম (আমার দুইটা বড়লোক কাজিনকে পড়াতাম, একটা তখন ফাইভে পড়তো, আরেকটা সিক্সে), তার উপর সপ্তাহ শেষে আলসেমি করতো, তাই ইচ্ছা হলে কারো সাথে মিটিং করতাম, ইচ্ছা না হলে না।

আমি গণহারে মিটিং করছি জেনেও ফটোকপির দোকানটার সামনে লাইন পড়ে যেত। আহা, কত ধরনের মেয়ে যে ছিল ঢাকায়! লম্বা, ফর্সা, মোটা, কালো… টেনেটুনে পাশ, লেখাপড়ায় ভালো… ঢঙ্গী, মহাঢঙ্গী, নির্ঘাৎ ফেল… ফুচকা পছন্দ করে, ফুচকা বিদ্বষী … এক কাপড়ে দুইবার দেখা যায় না, বছরে একটার বেশি ইউনিফর্ম কিনতে পারে না… কখনো বিয়েই করবে না বলে ঠিক করেছে, বাবা-মা এখন থেকেই পাত্র দেখছে …

আমাকে কেউ মন দিতে চাইলে আমি না করতাম না। আমার জীবনে কখনো গার্লফ্রেন্ডের অভাবও ছিল না। এত এত মেয়েদের ভিড়ে মিথিলাকে আমার মনে রাখার কোন কারণই ছিল না। মিথিলাই বা কেন আমাকে মনে রেখেছিল, আল্লাহ মালুম।

বহু বছর পর গতকাল ওর কথা আমার মনে পড়লো। ফেসবুকের সূত্রে জানতে পারলাম, এসএসসি ’৯৭ ব্যাচের উম্মে সাদিয়া রহমান ওরফে মিথিলা রোড অ্যাকসিডেন্টে মারা গেছে।


এমনিতে আমি খুব একটা ফেসবুকিং করি না। করলেও সেটা গুপ্তচরের মতো; লগ ইন করি, ঘুরি ফিরি, কোন লাইক-কমেন্ট না দিয়ে আবার বের হয়ে যাই।

ঘটনার সূত্রপাত ঈদের শপিং করতে গিয়ে। সীমিত আকারে কেনাকাটা করার কথা ছিল, কিন্তু মার্কেটে এসে ভিড়ের ঠেলার আর কিছু কিনতে ইচ্ছা হচ্ছিল না। এস্‌কেলেটারে একটা দাঁড়িওয়ালা লোকের সাথে ধাক্কা খেলাম।

ব্যাটাকে ঝাড়ি মারতে যাবো, এমন সময় সে বলে উঠে – “আরে দোস্ত, তুই! ম্যালাকাল পর!”

কে এটা? চলন্ত সিঁড়িটা ছয় তলায় গিয়ে ঠেকে। লোকটা মাস্ক খুলতে নিচ্ছে দেখে আমি প্রায় চিৎকার করে বললাম, “আরে কোভিড তো, কোভিড!” কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গেছে। অবাক হয়ে দেখলাম, সুজন দাঁত বের কতে হাসছে। হারামজাদার সাথে একসাথে কোচিং করতাম, এইট থেকে ইন্টার পর্যন্ত।

আমিও হেসে বললাম, “শালার পুত, ‘ম্যালাকাল পর’ বৈলা মারবি নাকি? ছয় ফুট দূরত্বে থাক।”

সুজইন্না জিভ কেটে একটু সরে গিয়ে মাস্ক অ্যাডজাস্ট করে। জনস্রোতের মধ্যে সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিং করে আমরা আড্ডা মারলাম। কত বছর পর দেখা? আঠারো, নাকি বিশ?

“পাক্কা চৌদ্দ বছর, দোস্ত,” সুজইন্না সারসের মতো গলা উঁচু করে বলে। “লাস্ট তোরে দেখছিলাম জিতুর বিয়াতে, মনে নাই?”

“আরে তাই তো!” আমি বলি।

“কি করস তুই? এখনো সাম্বাদিকতা?”

“হু, তুই?”

“কাঠের বিজনেস। বাই দ্য ওয়ে, তোর ‘কাঠের’ অবস্থা কি? বর্তমানে গার্লফ্রেন্ডের সংখ্যা কয় লাখ? হিহিহি!“

“আরে না না, একটাই!”

“কস কি বেটা, মাত্র একটা গার্লফ্রেন্ড হৈলে তো তোর বদহজম হৈব! হাহাহা!”

আমিও হাসলাম। এই জীবনে আমার রেপুটেশন চেইঞ্জ হওয়ার কোন সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। বিদায় নিতে নিতে সুজইন্না বলে, “তোরে ফেসবুকে অ্যাড করুম, যোগাযোগ রাখিস কিন্তু।”

করলাম অ্যাড। তারপর থেকে শালা প্রতিদিন আমাকে দুনিয়ার হাবিজাবি জিনিস মেসেজ করে। কোন্‌ পোস্ট দশজনকে ফরোয়ার্ড করলে মার্ক জাকার্বার্গ আমাকে পাঁচ হাজার কোটি টাকা দিবে, কোন্‌ দোয়া কপি-পেস্ট করলে বেহেশতের টিকেট পাওয়া যাবে, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দশ নারীর ভিডিও, এইসব।

রাগের চোটে ওকে আনফলো করতে যাবো, এমন সময় দেখি একটা গ্রুপ ইনভাইট পাঠালো। “এই পাপী চোখে (আমাদের কোচিং সেন্টারে) যা যা দেখেছি”। বিষয়বস্তু প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীদের স্মৃতিচারণ। দেখে ভাবলাম, ভালোই তো, চান্স পেলে এখানকার কিছু পোস্ট নিয়ে একটা ফিচার লিখে ফেলা যাবে। তখনই খবরটা চোখে পড়লো।

দেশের বাড়ি যাওয়ার পথে জয়দেবপুর-টাঙ্গাইল মহাসড়কে প্রাইভেট কারের সাথে বাসের সরাসরি সংঘর্ষ। গাড়িতে ছিল চার জন। চালক পলাতক, বাকিরা ঘটনাস্থলেই নিহত। মিথিলার সাদাকালো একটা ছবিও দেয়া আছে। ওকে শেষ দেখেছিলাম ঢাকা কলেজের আমলে; তখনকার তুলনায় চেহারাটা একটু শুকনা। রিপোর্টে লেখা, পরের সপ্তাহে নাকি ওর বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। সেটা আর হলো না। খবরটা যে শেয়ার করেছে, তাকে ঠিক চিনলাম না – কামারুজ্জামান নামে একজন। (এইটা কেমন নাম? ‘কামরুজ্জামান’-এ সমস্যা কি?)

গায়ত্রী হঠাৎ জিজ্ঞেস করে, “তোমার কি হৈছে?”

আমি বকের মতো ল্যাপটপের পেছন থেকে উঁকি দিয়ে বললাম, “কৈ, কিছু হয় নাই তো?”

“মনে হচ্ছে কম্পিউটারে ভূত-টূত দেখছ। কেমন যেন থম্‌ মেরে আছ।”

“না এমনি। এক্ষণ জানতে পারলাম আমার এক ফ্রেন্ড মারা গেছে।“

“স্যরি টু হেয়ার দ্যাট, পাখি। ক্লোজ ফ্রেন্ড ছিল?”

“না, সেরকম কেউ না।”

বলে আমি ফেইসবুকে ডুবে যাই।


এমন না যে আমার জীবনটা খারাপ যাচ্ছে। না, সেটা কোনভাবেই বলা যাবে না।

বড় পত্রিকায় ফিচার এডিটরের জব করি। কোন ধার-দেনা নাই, আব্বা-আম্মার প্রতি দায়িত্ব পালন করি, হাল্কা মদ-বিড়ি খাই, বন্ধুবান্ধবও বলতে গেলে নাই। দরকারের বেশি কারো সাথে মিশি না, অফিসে কারো সাথে গসিপ করি না, ফিটফাট হয়ে চলি, কম কথা বলি, একমাত্র গার্লফ্রেন্ডের সাথে ঘুরি-ফিরি খাই-দাই।

যতদূর বুঝি, সবাই আমাকে নিয়ে খুব খুশি। কেউ কেউ ভাবে আমি খুব কোয়ালিফাইড, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, বা ফেরেশতা টাইপের – আমি মনে মনে হাসি। হয়তো কৈশোর-যৌবনেই এত মেয়ের সাথে মিটিং করে ফেলেছি যে জগতের প্রতি আমার আকর্ষণ সীমিত। আজো মাঝেমধ্যে কোন বিয়ের দাওয়াতে গিয়ে আবিষ্কার করি, হাবাগোবা একটা বরের পাশে আমার কোন এক্স-গার্লফ্রেন্ড বউ সেজে আছে। আমাকে দেখে মেয়েগুলি বিয়ের মেকআপেও ফ্যাকাশে হয়ে যায়। আমি সযত্নে তাদেরকে না চেনার ভান করি।

আমার এখনকার গার্লফ্রেন্ডের সাথে লিভিং টুগেদার করছি প্রায় দুই বছর হয়। শুরু থেকেই গায়ত্রীর সাথে আমার গায়ে গায়ে সম্পর্ক। সে-ও সম্পর্কের ব্যাপারে সিরিয়াস না, আমিও না। শুধু সাথে থাকার একটা মানুষ চাই, যাকে ইচ্ছে হলেই জড়িয়ে ধরা যায়, একসাথে চা খাওয়া যায়, গল্প করতে করতে ঘুমিয়ে পড়া যায়। আমাদের দুইজনের ফ্যামিলিই লিভিং টুগেদারের ব্যাপারটা নিয়ে চরম লজ্জিত। প্রায়ই তাদের কাছ থেকে প্রেশার আসে বিয়ে করার জন্য।

গায়ত্রী ব্যাপারটা হেসে উড়িয়ে দেয়। আমিও দিতাম, কিন্তু ইদানিং কেন যেন মনে হচ্ছে, বিয়ে করাটা দরকার। সত্যি বলতে কি, সেই বিয়েটা যে ওর সাথেই হতে হবে, তা না। আবার নিজের জন্য ওর চেয়ে উপযুক্ত কাউকে খুঁজে পাবো, সেরকমও মনে হয় না। আপাতত এই ক্ষুদ্র কনফিউশনটা বাদ দিলে আমার জীবনটা ফুরফুরা।

তবু হঠাৎ যখন মুষলধারে বৃষ্টি হয়, বা সেদিন যেমন একটা হিজাবী মেয়েকে রিকশায় যেতে যেতে হেসে ফোনে কথা বলতে দেখলাম – বুকটা কেমন খালি খালি লাগে, ইচ্ছে হয় কৈশোরের দিনগুলোয় ফিরে যাই। কারণ ছাড়াই কেন এরকম ফিলিংস হয়? জীবন বড়ই অদ্ভুত।


সিগারেট ধরিয়ে বারান্দায় বসে থাকতে ইচ্ছে করছিল না, তাই বাসা থেকে বের হয়ে গেছি। গ্রীন রোডে হাঁটাহাটি করতে করতেই ধাম্‌ করে কারেন্ট চলে গেল।

কাছেধারে ট্রান্সফর্মার বার্স্ট করেছে বোধহয়। আমার হাতে বেনসন, মস্তিষ্কে বোধোদয়। কি সেই বোধোদয়, সেটা এখনো অজানা। জানতেও চাই না খুব সম্ভবত। আকাশে মেঘে ঢাকা তারা, তড়িতের অভাবে রাস্তার ল্যাম্পগুলো নিভে গেছে। মেঘের আড়াল থেকে চাঁদ উঁকি দিচ্ছে আবার হারাচ্ছে, লুকোচুরি খেলা শিশুদের মতো। হেডলাইট ছুটে বেড়াচ্ছে, রিকশা টুংটাং করছে, কে যেন চেঁচাচ্ছে ঐ সাইড দেন, সাইড দেন…

লাইফে খুব বেশি ভুল করিনি, সতর্ক হয়ে চলার চেষ্টা করেছি। তবু আজ রাতে, ঠিক এই জায়গাটায়, এই রহস্যময় অনিশ্চয়তায় – যেখানে নিজেও জানি না কেন বুকের মধ্যে খালি খালি মনে হয় – কিভাবে এসে পৌঁছালাম আমি? ইচ্ছে করে গভীর কোন তালপুকুরে ডুবে যাই। কিন্তু সেরকম তালপুকুর কই?

রাতের আকাশ দেখতে দেখতে বিড়বিড় করে নিজেকে বললাম, ”প্যাথেটিক ফ্যালাসি।” ততক্ষণে আমি একটা সিএনজিতে। সিএনজিঅলা মাথা ঘুরিয়ে বললো, “ভাই কিছু বললেন?”

“হু।”

“কী, আবার বলেন তো?”

“প্যাথেটিক ফ্যালাসি।”

“কী?”

“প্যাথেটিক ফ্যালাসি। সাহিত্যের একটা টার্ম। মানে গল্পের সিন-সিনারি যখন মেইন চরিত্রের মনের অবস্থার প্রতিফলন হয়।”

“স্যরি ভাই, আপ্নের কথাবার্তা কিছু বুঝতাছিনা।”

“মানে ভেতরে অন্ধকার হৈলে বাইরেও অন্ধকার।”

“ও তাই কন, হে হে… তা অন্ধকার হৈলে তো একটু সমেস্যাই।”

খানিক বাদে হাতিরঝিলের জ্যামে বসে থাকতে থাকতে লোকটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে উঠে – “পুরাটাই ভুল রে ভাই। জন্মানোই হৈছে কাল, পুরাটাই ভুল।”


কত কাল আগের কথা! কলাবাগান বাস স্ট্যান্ডের উল্টা দিকে ছিল কোচিংটা।

পুরানোগোছের তিনতলা একটা বিল্ডিং। শায়েস্তা খাঁর আমলে মনে হয় হলুদ রঙ ছিল, তারপর আর কোনদিন কেউ রঙ করে নাই। গেটের উপরে বিশাল একটা সাইনবোর্ড। গাঢ় নীলের ব্যাকগ্রাউন্ডে বড় বড় সাদা অক্ষরে লেখা – “বুয়েট ও ঢাকা ভার্সিটির শিক্ষার্থীদের দিয়ে ক্লাস ফাইভ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত কোচিং করানো হয়”, বা এরকম একটা কিছু।

ফুটপাতের গা ঘেঁষে ঘুপচি স্টেশনারির দোকান। দোকানের পেটের ভেতর প্রাচীন একটা ফটোকপির মেশিন। শুধু ব্ল্যাক এন্ড ওয়াইট কপি করা যেত, তাও আবার শুধু কাগজের এক সাইডে। তাতেই দোকান মালিকের কি পার্ট! ব্যস্ত মেইনরোডে সারাক্ষণ হর্ন, যানবাহনের কুচকাওয়াজ, অনন্তকাল ধরে কারো কারো হেঁটে যাওয়ার শব্দ… কিভাবে কিভাবে যেন তার চেয়েও জোরে, হাঁপানির রোগীর মতো সাঁইসাঁই শব্দ তুলে ফটোকপির মেশিনটা সবাইকে খুশি করার জন্য দিন-রাত চলতো। কপির কোয়ালিটি দেখে তবু কেউ খুশি হতো, কেউ হতো না।

বাইরে সূর্য ডুবুডুবু, ভেতরে সস্তা কালির গন্ধ – আমার সেই রমরমা দিনগুলোয় বৃত্তি কোচিং শেষে আমি আর দোকানের পিচ্চিটা প্লাস্টিকের টুল নিয়ে বসে যেতাম। ঠিক কী ছিল সেই যুগে আমার মধ্যে? কী ফেলে এসেছি, যেটা আজো পাঁজড়ের গহ্বরে হাতড়ে বেড়াচ্ছি? (নাকি সবারই এরকম হয়?)

না ছিলাম আমি ক্লাসের সবচে ফর্সা, না সবচে হ্যান্ডসাম। পড়ালেখায় ছিলাম মোটামুটি, খেলাধূলাতেও সেইরকম। টাকাপয়সা তো একেবারেই ছিল না – টিউশনি করে নিজের কোচিংয়ের খরচ চালাতে হতো। এক কথায়, যেসব ছেলেদের টেনশনে মিডল ক্লাস ফ্যামিলির গার্জিয়ানরা ব্লাড প্রেশারের ওষুধ খান, আমি ছিলাম ঠিক ঐরকম। বরাবরই আমি খুব অর্ডিনারি; হয়তো একটা ব্যাপার ছাড়া। কিভাবে কিভাবে যেন জ্ঞান হওয়ার পরপরই বুঝে গিয়েছিলাম, মানুষ কখনো চেইঞ্জ হয় না।

সময় বদলায়, কিন্তু স্বভাব বদলায় না। অতএব লাইফে হ্যাপি হওয়ার উপায় হচ্ছে কারো কাছ থেকে কিছু আশা না করা। এই বিরাট ফিলোসফিটা যেহেতু গ্যাঁদাকালেই শিখে ফেলেছিলাম, সমবয়েসীদের তুলনায় কেমন যেন রিল্যাক্সড্‌ থাকতাম। ব্যস, এটুকুই ছিল আমার বিশেষত্ব।


আমার প্রথম গার্লফ্রেন্ডের নাম ছিল অনিতা। লতায়-পাতায় আত্মীয়তার সূত্রে পরিচয়।

সংসদ ভবনের সামনে চটপটি খেতে খেতে তাকে বলেছিলাম – “দেখ তুমিও জানো, আমিও জানি, এই বয়সের রিলেশনশিপ কখনো বিয়ে পর্যন্ত যায় না। কাজেই চলো ভালো ফ্রেন্ড হই, একসাথে যতটা সময় আছি, এনজয় করি।“

অনিতা তো ইম্প্রেসড। আমি ভেবেছিলাম সে খুশি হয়ে বিলটা দিবে – সেটা তো দিলই, সাতদিনের মাথায় আমার কপালে একটা কিস-ও খেয়ে বসলো। আমাকে আর পায় কে! রিকশায় হাত ধরে ঘুরতে ঘুরতে পরের কয়েকটা মাস কিভাবে গ্রীষ্ম বর্ষা শরৎ হেমন্ত হয়ে গেল, টেরই পেলাম না।

একদিন দেখি মানিব্যাগে একটা টাকাও নাই। মাঝে-মধ্যে অনি বিল দিলেও রিকশাভাড়া এবং সাধারণত ফাস্ট ফুডের দোকানে টাকা দেয়াদেয়ির ব্যাপারটা আমাকেই সামলাতে হতো। টিউশনির টাকা পেতে তখনো পাক্কা এক সপ্তাহ বাকি। কি আর করা?

আব্বার ড্রয়ার থেকে পঞ্চাশ টাকার তিনটা নোট সরালাম। তারপর চুলে জেল মেখে, পকেটে মানিব্যাগ গুঁজে, হাল্কা দাঁত ব্রাশ করে বাথরুমের দরজা খুলেই দেখি – স্বয়ং জাহাপনা। আমি আমাশার রোগীর মতো কুঁচকে গিয়ে বললাম, “আব্বা আপনি? বাথরুম করবেন?”

আব্বা গম্ভীর গলায় বললেন, “না, রান্না করতাম। লেট্রিনের সামনে খাড়ায়ে মাইনষে রান্না করে না?”

“জ্বি, জ্বি করে।”

“জ্বি জ্বি করতাছস ক্যান হারামজাদা? ফাইনাল পরীক্ষা কবে?”

“এই তো আর –”

“আর কি? হ্যা? আমতা আমতা করতাছস ক্যান? ফাইনাল পরীক্ষা কবে?”

“…”

“কথা কছ না ক্যান শুওরের বাচ্চা?”

আতঙ্কে নীল হয়ে আমি তাকিয়ে থাকি। এক্ষনই একটা চড় খাবো, মুখের জিওগ্রাফি ভেস্তে যাবে। বাসার জিনিসপত্র ভেঙেভুঙে লোকটা বাড়ি মাথায় তুলবে। মানিব্যাগের ভেতর থেকে আব্বার টাকাটা যেন বাসের হেল্পারের মতো চিৎকার করে উঠতে চায় – উস্তাদ এইদিকে, আমি এইদিকে! সেকেন্ডে দেড়শ’ মাইল বেগে আমার হৃৎপিন্ড বুকের ভেতর থেকে আমাকে হাতুড়ি-পেটা করতে থাকে। অবশেষে মা যখন এসে আমাকে উদ্ধার করে, ততক্ষণে আমি ধরা না খেয়েও দশবার তওবা করে ফেলেছি, আর কোনদিন কারো টাকা চুরি করবো না।

দিনটা ছিল শুক্রবার। রাইফেলস স্কোয়ারে পৌঁছে দেখি, অনি আসে নাই। আধা ঘন্টা মোবাইলের দোকানগুলির সামনে পায়চারি করতে করতে হঠাৎ কেন যেন সন্দেহ হলো। ফোন করলাম, ধরলো না। সাতাশ বার কল করার পর মেসেজ আসলো, সানি সামনে আমার প্রি-টেস্ট পরীক্ষা। ডিস্টার্ব করবা না।

আমি ভয়ে ভয়ে তবু মেসেজ করলাম, প্রি-টেস্ট মানে? ও রিপ্লাই দিল না।

দুইয়ে দুইয়ে চার করে, অনিতাদের মহল্লায় রীতিমত গোয়েন্দাগিরি করে অবশেষে জানতে পারলাম, ও আসলে ক্লাস টেনে পড়ে, ভিকারুননিসায় (আমাকে বলেছিল নাইনে পড়ে, উদয়নে)। তার চেয়ে বড় কথা, ঢাকা শহরের মোটামুটি প্রত্যেক পাড়ায় ওর আমার মতো এক-দুইটা বয়ফ্রেন্ড আছে (আসল বয়ফ্রেন্ড আর্মিতে, কিছুদিন আগে মিলিটারি একাডেমিতে মারামারি করে কার যেন মাথা ফাটিয়ে ফেলেছে)।

এইসব ভয়ানক তথ্যেও কেন যেন আমার হুশ হলো না। গাধার মতো ভাবলাম, প্রি-টেস্টটা দিয়েই অনি বুঝতে পারবে, আমিই ওর জীবনের খাঁটি প্রেম। তখন হিন্দি সিনেমা স্টাইলে ট্রেন স্টেশন থেকে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে এসে আমার বুকের উপর আছড়ে পড়বে, বা সেরকম একটা কিছু। কিন্তু কিছুদিন পরই ও ঠাস করে আমার সাথে ব্রেক-আপ করে ফেললো।

আমি ফোন করে কান্না কান্না গলায় বললাম, “ওয়াই তুমি আমার সাথে ব্রেক-আপ করতেছ?”

তখন অনি নির্বিকার গলায় বলে, “সানি, ফেব্রুয়ারি মাসে আমার গায়ে হলুদ। খবরদার এই নাম্বারে আর ফোন করবা না। আর কান্নাকাটি থামাও, লাইফে কারো জন্য কান্দার কোন মানে নাই।“

ঐ যে বললাম, লাইফে কারো কাছ থেকে কিছু আশা করতে নাই। আশা করার ভুলও আমি আর কখনো করি নাই। (“বাংলাদেশের আশার ফুল” বলে মাথায় না উঠালে মোঃ আশরাফুল আজকে কোথায় থাকতো, ভাবা যায়?) কিন্তু ছ্যাঁকটা খেয়ে ভীষণ কষ্ট পেয়েছিলাম। পাক্কা দুইমাস ঘুমাতে যাওয়ার আগে কেঁদে কেঁদে বালিশ ভিজিয়ে ফেলতাম। একদিন মনের দুঃখ কোচিংয়ের এক বন্ধুর সাথে শেয়ার করলাম।

বন্ধু কিছুক্ষণ আহারে-উহারে করে বললো, “দোস্ত, ভাবির কোন ছবি আছে তোর কাছে?”

ছবি সেন্ড করলাম। পরদিন কোচিং সেন্টারে গিয়ে আবিষ্কার করি, প্রথমত অনিতা অবিকল রাভিনা ট্যান্ডন নামের বলিউডের এক উঠতি নায়িকার মতো দেখতে। এবং দ্বিতীয়ত, পুরা কোচিংয়ে সেন্টারে এমন কেউ নাই যে আমার সেন্ড করা ছবিটা দেখে নাই। আমাদের চ্যাংড়া ইসলামিয়াত স্যার তো বলেই ফেললো – “এইটা সানির গার্লফ্রেন্ড, এইটা? কী পাইলো সে তোমার মধ্যে, সানি?”

আমি বিড়বিড় করে বললাম, “স্যার এক্স গার্লফ্রেন্ড। এক্স।”


তারপর থেকে আমি মেয়েদের মধ্যে ভাইরাল হয়ে গেলাম। কয়েকজন গার্জিয়ান কমপ্লেইন করলো, তখন আমি “কৈ না আন্টি প্রেম করছি না” বলে ইন্টারভিউয়ে ফটোকপির দোকানের পিচ্চিটাকে রাখা শুরু করলাম।

কোচিংয়ের প্রিন্সিপাল রঞ্জু স্যার আমাকে ডেকে শান্টিং দিলেন, কিন্তু উনার চোখে তখন ব্যবসা বড় করার স্বপ্ন, আর ততদিনে আমার সাথে মিটিং করার লোভেই কিছু মেয়ে কোচিংয়ে ভর্তি হচ্ছিল – তাই পার পেয়ে গেলাম।

কিছুদিন পর আশেপাশের কোচিং সেন্টারগুলি এবং ধানমন্ডির একটা বিখ্যাত ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের মেয়েরাও আমার সাথে ইন্টারভিউ-মিটিং করা শুরু করে দিলো। সত্যি বলতে কি, মিথিলা কবে আমাদের ব্যাচে ভর্তি হয়েছিল, খেয়ালও করি নাই। কোন এক ক্লাসে লক্ষ্য করলাম একটা হিজাবী, পড়াশোনায় খুব মনোযোগী টাইপ মেয়ে আমাদের সাথে ফিজিক্স ক্লাসে – ব্যস ঐ পর্যন্তই। বা অন্যভাবে বলতে গেলে, সে আমার টাইপেরই না যে তাকে খেয়াল করবো।

একদিন ফটোকপির দোকানটার সামনে লম্বা লাইন ছিল। আমি আর পিচ্চি দুজনই ইন্টারভিউ নিতে নিতে টায়ার্ড। সব শেষের মেয়েটার আগে যে মেয়েটা এসে ঢুকলো, তার নাম সোহানা। পড়ালেখায় মোটামুটি, তবে সুন্দর করে মেকাপ করে। সমস্যা হচ্ছে, ঢং করে সে নিজেকে কখনো ‘সুহানা‘, কখনো ‘সু‘ বলে ডাকে। ফার্স্ট ইমপ্রেশন খুবই ইমপর্টেন্ট; ওকে আমার কি বলে সম্বোধন করা উচিৎ?

যাই হোক, ছলে-বলে-কৌশলে সেই ইন্টারভিউ পার করলাম। পিচ্চিটাকে বললাম, “আরো আছে?” হঠাৎ একটা মনোযোগ আকর্ষণ-মূলক কাশি। বাইরে উঁকি দিয়ে দেখি মিথিলা।

আজো মনে আছে, হাসিমুখে ওকে দোকানের ভেতরে আসতে বলে ভাবছিলাম – এরকম একটা মেয়ের সাথে কি-ই বা কথাবার্তা বলা যায়? কিছু একটা বলার জন্য মুখ খুলবো, এমন সময় সে নিজেই স্বরস্বতীর মতো এক হাত তুলে গড়গড় করে বললো: “আমার নাম মিথিলা। তোমার মতো ছেলের সাথে ডেটিং করার আমার কোনই ইচ্ছা নাই। কিন্তু তোমাকে নিয়ে গতকাল ভোর রাতে একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখসি। শুনতে চাও কি দেখলাম?”

হঠাৎ মুষলধারে বৃষ্টি পড়া আরম্ভ করে। মুহূর্তের মধ্যে নুহের প্লাবনে মিরপর রোড ভেসে যায়। সাইড করে রাখা একটা রিকশায় রিকশাঅলা পর্দা সেট করার আগেই পর্দাটা উড়ে চলে যায়। ফটোকপির দোকানে বসে বসে পিচ্চিটা অবাক হয়ে একবার আমাকে দেখে, একবার মিথিলাকে। দোকানের টিনের ছাদে জ্বিনের নৃত্যের মতো বৃষ্টি নাচতে পড়তে থাকে। দোকানের ভেতর এক সাইডে ফটোকপি করা কিছু কাগজ বাতাসে খিলখিল করে ছুটোছুটি শুরু করে। দোকান মালিক পিচ্চিটাকে খিস্তি গালি দিয়ে ডাকতে থাকে। সেদিকে পিচ্চির, মিথিলার, আমার, কারোরই হুশ নাই।

আমি মাথা নেড়ে সায় দেই – হ্যা, শুনতে চাই।


“হ্যালো?”

“কিরে সুজইন্না, খবর কি তোর?”

“আরে সানি, দোস্ত! আস্‌সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহু।”

“ওয়ালাইকুম –”

“আছি ভালো আলহামদুলিল্লাহ। তোর কি খবর?”

“এইতো। আচ্ছা একটা কথা, আমাদের সাথে মিথিলা নামে একটা মেয়ে কোচিং করতো, চিনতি?”

“ঐ যে শিবচর বাড়ি, ঐ মেয়েটা?”

“কোথায় বাড়ি বলতে পারবো না, হিজাব করতো। এইটের শেষে ভর্তি হৈছিল –”

“আরে হ্যা হ্যা, ঐ-ই তো। তোর জন্য রুমানারে ঝাড়ি দিলো যে।”

“সুজু, ভুল করতেছে মামু। এরকম কিছু ঘটে নাই।”

“আরে ঘটছে ঘটছে মামু, তোর তখন টাইফয়েড হৈছিল। রুমানা আর আরেকটা মেয়ে মান্নান স্যারের ক্লাসের মধ্যেই তোকে নিয়ে কি জানি বলে হাসাহাসি করতেছিল। মান্নান স্যারের কথা মনে আছে?”

“হ্যা, মনে আছে মান্নান স্যারের কথা। বিশিষ্ট ভদ্রলোক।”

“হু… উনি ক্লাস কন্ট্রোল করতে পারতেছিলেন্না সেইদিন। যাউক, তো মিথিলা থার্ড রো থেইকে উইঠা গিয়া স্যারের সামনে রুমানা আর ঐ মেয়েটারে রামঝাড়ি দিলো, তোর পিঠ-পিছনে তোর গীবত গাওয়ার জন্য।”

“ও আচ্ছা, আমি জানতাম না।”

“হুম। আমার তখন একটু লজ্জা লাগছিল রে। যে তোর বন্ধু হৈয়া তোরে ডিফেন্ড করতে গেলাম না, কিন্তু এই অপরিচিত মেয়েটা সেটাই করলো। তখন টুকটাক কথা হৈছিল।”

“আচ্ছা।”

“খুবই ভালো মেয়ে। নাইনের হাফ ইয়ার্লি পর্যন্ত কোচিং করছিল না?“

“মনে হয়।”

“হুম। হঠাৎ মিথিলার কথা তুললি, কাহিনী কি?”

“এমনি। মিথিলা মারা গেছে রে, ফেইসবুকে দেখলাম। ভাবলাম তোর সাথে শেয়ার করি।“

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সুজইন্না বলে, “আহারে। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজেউন।”ফোন রাখার কিছুক্ষণ পর একটা কথা মনে পড়লো। আমি ইন্টারনেট ঘাটাঘাটি করে সঙ্গে সঙ্গে আবার ফোন করলাম।

“সানি, দোস্ত! আস্‌সালামু আলাইকুম ওয়া –”

“সুজন, তুই শিওর মিথিলার বাড়ি শিবচর ছিল?”

“হ্যা শিওর, আমার আম্মুর বাড়িও মাদারিপুর শিবচর, তাই কথাটা মনে আছে।”

“তাইলে একটা ঘাপলা আছে রে।”

“কী?”

“আমার মনে হয় মিথিলা মারা যাওয়ার রিপোর্টটায় ঘাপলা আছে।”

“কি কস না কস! তোর মাথা আউলায়ে গেছে, সানি!”

“রিপোর্টে লেখা, দেশের বাড়ি যাওয়ার পথে জয়দেবপুর-টাঙ্গাইল হাইওয়েতে মিথিলাদের গাড়িটা অ্যাক্সিডেন্ট করে। কিন্তু ওর বাড়ি শিবচর হলে গাড়িটা ঐ রাস্তায় যাচ্ছিল কেন?”

“… হয়তো ঘুরা পথে যাইতেছিল।”

“আরো ব্যাপার আছে। আরো যারা মারা গেছে, তাদের নাম উল্লেখ করা নাই। থানায় ড্রাইভারের নামে কেস দিছে কিনা সেইটা লেখে নাই। আর আমি ভোরের কাগজের আর্কাইভ সার্চ দিছি, ঐদিন ঐ নিউজই ছাপা হয় নাই।”

“হায় হায়! এ তো দেখি পুরা রহস্য গল্প!”

“তুই কামারুজ্জামান নামে কাউকে চিনিস আমাদের ব্যাচের, একসাথে কোচিং করতো?”

“না। যেই বিখাউস নাম, থাকলে অবশ্যি চিনতাম।”

“আমারও তাই মনে হয়। যাই হোক, সে-ই রিপোর্টটা শেয়ার দিছে। আমি মেসেজ করছি, দেখি কি হয়।”

“ওকে, আমিও খোঁজ লাগাইতেছি। দেখি কিছু জানা যায় কিনা।”

“সুজইন্না, তোর কি মনে হয় মিথিলা আসলে বাইচা আছে?”

“ইনশাল্লাহ, দোস্ত। ইনশাল্লাহ।”


তার চোখদুটো কালো, তমশার মতো। চুল খুব সম্ভবত ঘাড় পর্যন্ত বা আরেকটু বড়, হিজাবের জন্য ঠিক বোঝা যায় না।

খুব একটা লম্বা না। অ্যাভারেজ হাইট। ফিগার নিয়ে মন্তব্য করতে পারছি না, করতে চাচ্ছিও না। একটু ভোঁতা নাক, টানা টানা চোখ, চিকন একজোড়া ঠোঁট। মিডল ক্লাস ফ্যামিলির মেয়ে, বা একটু আপার-মিডল ক্লাস হয়তো; কাপড়-চোপড় দেখে অন্তত মনে হয় তাই। যতদূর মনে পড়ে, খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে তার আগ্রহ কম ছিল। কোচিংয়ের ফাঁকে ফাঁকে অনেকে পিৎজা লেক-এ ঢুকতো, বা রাস্তার পাশ থেকে ছোলা বা বাদাম বা কিছুমিছু কিনে খেত – ও খেতো না। পড়ালেখায় মনোযোগী হলেও রেজাল্টের দিক দিয়ে মোটামুটি। যেন মনটা সবসময় অন্য কোথাও থাকতো। সেকেন্ড বা থার্ড বেঞ্চে বসতো সে। চুপচাপ, পরিপাটি একটা মেয়ে। কোন্‌ স্কুলে পড়তো কখনো জিজ্ঞেস করিনি, মনেও করতে পারছি না। কারো সাথে তেমন একটা মিশতো না। চুপচাপ ক্লাস করে একটা সাদা টয়োটা স্টেশন ওয়াগনে করে বাসায় ফিরতো। হাসতো খুব সুন্দর করে। নিষ্কলুষ, ভালো মানুষের হাসি।

আমি আর পিচ্চিটা অপলক তাকিয়ে থাকি। মিথিলা বলতে শুরু করে:

“গতকাল ভোর রাতের কথা। আমি স্বপ্নে দেখি, সানি, তুমি আর আমি ক্লাস থ্রিতে পড়ি, ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলে। কেন ঐ স্কুল, আমি বলতে পারবো না। দেখলাম ক্লাসে যেমন খুশি তেমন সাজো অনুষ্ঠান হচ্ছে। আমি সেদিন গেছি বউ সেজে, আর তুমি গেছ হিন্দু দেবতা বিষ্ণু সেজে। আমার শাড়িটা লালের মধ্যে সাদা স্ট্রাইপ, পায়ে লাল ফিতার ইমিটেশন লেদারের স্যান্ডেল। ঘোমটার আড়ালে আমি দাঁত বের করে হাসছি। তোমার গায়ের রঙ হাল্কা নীল, চার হাত, একদম দেবতার মতো সাজ। আমরা তখনো কেউ কাউকে চিনি না, কিন্তু একজন আরেকজনকে দেখে স্মাইল করলাম। সেই অনুষ্ঠানে আমরা দুজন ফার্স্ট হলাম, হাত ধরে ছবি তুললাম। ঘুম ভেঙে দেখি, ফজরের আযান হচ্ছে।”

আমি কিছুটা হতাশ হয়ে বললাম, “ব্যস?”

“হু। স্বপ্নটা অদ্ভুত না?”

“হ্যা...”

“আমি খুব একটা স্বপ্ন-টপ্ন দেখি না। এইটা দেখে মন ভালো হয়ে গেছিল, তাই ভাবলাম তোমাকে বলি।”

পাশ থেকে পিচ্চিটা নন-স্টপ কাশতে থাকে। এক পর্যায়ে মিথিলা বিরক্ত হয়ে বলে, “কাশতেছিস কেন? সিভিট খাবি? আমার ব্যাগে আছে।”

পিচ্চি কঠিন গলায় বলে, “জ্বে না। তয় মাথা খারাপের অষুধ থাকলে দেন।”

“মাথা খারাপের অষুধ আমার কাছে থাকবে কেন?”

“হিজাব পিন্দা এইসব হেন্দু-মার্কা স্বপ্ন দেখেন তাই কইলাম।”

মিথিলা শীতল গলায় বলে, “স্বপ্ন তো আর আমি ইচ্ছা করে দেখি না। আর আমি হিজাব পড়ি দেখে এই কথা বলতেছিস? এই বয়সে এত চোপাবাজি কই শিখলি? জানিস আমি প্রত্যেক রাতে দোয়া ইউনূস পড়ে ঘুমাতে যাই?”

“তবু আপ্নের ঈমানের ঠিক নাই।”

“তুই কি আল্লাহ যে তোর কাছ থেকে আমার ঈমানের সার্টিফিকেট নেওয়া লাগবে? ফাজিল কোথাকার!”

পিচ্চিটা রাগ করে উঠে চলে যায়। মিথিলাও উঠতে উঠতে বলে, “আগেই বলছি তোমার সাথে ডেটিং করার ইচ্ছা নাই। স্বপ্নটার কথা তোমাকে জানাইতে ইচ্ছা হৈছিল, তাই জানাইলাম।” তার একটু পরে এসে আমাকে দশ টাকার একটা নোট দিয়ে বললো, “ছ্যাড়াটাকে ঝাড়ি দিয়ে খারাপ লাগতেছে। ওকে দিও, কিন্তু বৈলো না আমি দিছি।”

বলে সে চলে যায়। আমি হতভম্ব হয়ে প্লাস্টিকের টুলে কিছুক্ষণ বসে থাকলাম।


কামারুজ্জামান এখনো আমার সাথে যোগাযোগ করেনি। তবে আমার মেসেজটা ‘সিন’, অর্থাৎ সে পড়েছে।

আজ কি হলো কে জানে – ধুম করে অফিস থেকে ছুটি নিয়ে ফেললাম। বললাম, ফ্যামিলি এমার্জেন্সি। তারপর ফ্যামিলির নাম ভাঙানোয় কিছুটা অনুতপ্ত হয়ে আব্বা-আম্মার সাথে দেখা করতে গেলাম। আমার প্রবল প্রতাপশালী পিতা বেশ কয়েক বছর ধরে আধা-প্যারালাইসিস হয়ে বিছানায় পড়ে আছেন। গিয়ে দেখি, মা’র মুখের ডান সাইডটা নীল হয়ে আছে।

মেজাজটা খারাপ হয়ে গেল। মাকে বললাম, “আমি আব্বার সাথে কথা বলতেছি। এখনো এইসব, ছিঃ!” সঙ্গে সঙ্গে মা বললো, “না না না, তোর আব্বা অসুস্থ মানুষ, কিছু বলতে যাইস না, প্লিজ!” ঐ যে বললাম, মানুষ কখনো চেইঞ্জ হয় না।

ঠিক এই কারণেই ইন্টারের পরপর বাসা থেকে বের হয়ে গিয়েছিলাম। আব্বার যখন-খুশি তান্ডব আর নিতে পারছিলাম না। একবার আব্বা আমাকে প্রাণপণে মারছে – তার সন্দেহ আমি নাকি তার প্যান্টের পকেট থেকে টাকা চুরি করেছি – তখন নিজের অজান্তেই বার্স্ট করলাম। মারতে মারতে সেদিন আমি আব্বাকে অজ্ঞান করে ফেলেছিলাম। মা কাঁদতে কাঁদতে আব্বাকে আগলে রেখেছিল, তা না হলে হয়তো খুনই করে ফেলতাম। তারপর আল-আমিন রোড থেকে এক কাপড়ে দৌঁড়ে চলে গেলাম আমার সেই পুরানো কোচিংয়ে।

কিন্তু ততদিনে আমি বড় হয়ে গেছি। কোচিংটাও বদলে গেছে। চারিদিকে নতুন মুখ, টিচার-স্টুডেন্ট-সিনিয়র-জুনিয়র কাউকেই চিনতে পারলাম না। বিল্ডিংটাও কেমন যেন নতুন নতুন। কিছুদিন আগেই রঙ করা হয়েছিল হয়তো।

তখন গেলাম ঢাকা কলেজে। পরিচিত এক বড় ভাইকে হাতে-পায়ে ধরে অবৈধভাবে হলে একটা সিট জোগাড় করলাম। টিউশনির টাকা দিয়ে সেখানে সংসার পাতলাম, আরেক ছেলেকে সেই সিট ভাড়া দিয়ে রুমের মাটিতে ঘুমাতাম। এইচএসসি’র রেজাল্ট বের হওয়ার পর ঢাকা কলেজেই ডিগ্রিতে ভর্তি হলাম।

বাসার সাথে যোগাযোগ নাই, টাকাপয়সা নাই, হলের ক্যাডারদেরকে তোয়াজ করে করে চলতে হয় – এরকম একটা অবস্থায় আমার প্রেমরোগ আরো বেড়ে গেল, এবং সেই ধাক্কায় কিছু চর্মরোগও হলো। সব মিলিয়ে আমার জীবনে খুব, খুব খারাপ অবস্থা। এমন একটা সময়ে নিউ মার্কেটে উদ্ভ্রান্তের মতো হাঁটাহাটি করছি, বইয়ের দোকানগুলির কাছে এসে শুনি – “আরে সানি, তুমি এখানে?”

দেখি, মিথিলা। সাথে ওর ছোটবোন। আমি বললাম, “আরে তুমি? কেমন আছো?”

“এইতো ভালো, বই কিনতে আসছি। তুমি কোথায় পড়ো?”

এডুকেশনাল ইনফরমেশন এবং ফোন নাম্বার বিনিময় হলো। ও পড়ে জগন্নাথে। দুইদিন পর কল করে বললো – “অনেকদিন কথা নাই! চলো দেখা করি!”

আমি ঠাট্টা করে বললাম, “মিটিং?”

“আরে না, ধুর। তোমার মতো ছেলের সাথে আমি মিটিঁং-ডেটিঁং করি না।”

সেটাই ছিল আমাদের শেষ দেখা। (‘শেষ’ মানেই অবশ্য শেষ না – আমার দৃঢ় বিশ্বাস ও বেঁচে আছে।) গাউছিয়ার একটা চটপটির দোকানে দুইজন বসলাম, আড্ডা মারলাম পুরানো বন্ধুর মতো। যদিও এর আগে কখনোই আমাদের বলতে গেলে কথাই হয়নি, ঐ স্বপ্ন-ময় ইন্টারভিউটা ছাড়া। এক পর্যায়ে আমি বললাম, “আচ্ছা, তুমি যে আমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখছিলা মনে আছে?”

“কেন থাকবে না? স্পষ্ট মনে আছে। তোমার চার হাতে কি কি ছিল সেটাও মনে আছে।”

“স্বপ্নটা দেখে কি তোমার মন খারাপ হৈছিল? নাকি ইট ওয়াজ আ গুড ড্রিম?”

মিথিলা মুচকি হাসলো। “আমি জানি তুমি কেন এই প্রশ্ন করতেছ, সানি। আমি তো ভাবছিলাম তুমি আমাকে ভুলেই গেছ। আমার স্বপ্নের ব্যাখ্যা খুঁজতে গিয়ে বুখারী শরীফ পড়বা ইম্যাজিন করি নাই।”

আমি কিছুটা লজ্জা পেয়ে বললাম, “আরে না না, হাদিস পড়ছি কে বললো?”

“তুমিই বলে দিছ। তোমার প্রশ্নটা বেশি স্পেসিফিক হয়ে গেছে। হাদিসে আছে, কোন স্বপ্ন দেখে খারাপ লাগলে সেটা শয়তানের দেখানো স্বপ্ন। আর ভালো লাগলে সেটা আল্লাহর দেখানো। আর তোমার প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে হ্যা।”

সেদিন বিলটা মিথিলাই দিয়েছিল। ওকে বিদায় দিয়ে ঢাকা কলেজে ফেরার পথে আমার মোবাইল, মানিব্যাগ সব ছিনতাই হয়। আর কখনো যোগাযোগ হয় নাই।


“সানি, দোস্ত – বিজি নাকি?”

“কিরে তুই লম্বা সালাম দিলি না যে?“

“আস্‌সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহু। শোন –”

“বল, শুনতেছি।”

“আমার বউ কয়েকদিন আগে আমার অফিসে আসছিল।”

“সুজইন্না, এই কথা বলার জন্য তুই আমারে ফোন করছস?“

“আবে না ব্যাটা, শোন না। আমার বউ আসলো, আইসা দেখে আমার টেবিলের উপর মিথিলার সাদা কালো ছবি প্রিন্ট করা। তোর ঐ রিপোর্ট থেকে। তারপর তো আমারে খুব কৈরা ঝাড়লো, ঘরে বউ ফালায়া আমি অন্য মাইয়াদের ফটো প্রিন্ট করি, আমার কোন লজ্জাশরম নাই, বেহায়া, ইত্যাদি। আমি যতই বলি আরে ব্যাপারটা তা না, শুইনা সে আরো চ্যাতে।”

“হু।”

“হু না, কর্মচারিরা সবডি শুনছে, আমার পুরা প্রেস্টিজ পাংচার। যাই হোক – তোর ভাবী একটু ঠান্ডা হওয়ার পর নিজে থেকেই হঠাৎ ছবিটা খেয়াল করে বলে, আরে এইটা তো মিথিলা আপু।“

আমি দম বন্ধ করে শুনতে থাকি। “তারপর?”

সুজইন্না কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে, “আমার মনে হয় তোর একজনের সাথে কথা বলা দরকার। তার কাছ থেকেই কাহিনীটা শুনিস।”

“কেন তুই এখন বল, সমস্যা কি? আর কার সাথে দেখা করার কথা বলতেছিস?”

“কামারুজ্জামান। সে-ই তোর সাথে দেখা করতে চাইছে।”

“ওয়েট, তুই এরে পাইলি কিভাবে?”

“আমার বউয়ের… দোস্ত, তুই নিজেই গিয়ে শোন।”


সেই চটপটির দোকানে দেখা হওয়ার কথা, সকাল এগারোটায়। এখন বাজে এগারোটা বিশ।

চলে যাবো কিনা ভাবছি, আর মনে মনে কামারুজ্জামান ব্যাটাকে খুঁজছি। কিছু আগে একটা মোটাসোটা গোঁফঅলা লোক মোবাইলে কথা বলতে বলতে বাকিতে দোকানদারের কাছ থেকে একপ্লেট ফুচকা নিয়ে গেল। আর কোন লোক এখন পর্যন্ত দোকানে ঢোকেনি। হঠাৎ একটা স্টাইলিশ কিন্তু মাথায় কাপড় দেয়া, হাতে মেহেদি দেয়া মেয়ে এসে আমার টেবিলে বসলো।

তার মুখে মাস্ক নাই দেখে নিজেই নিজের মাস্কটা ঠিকঠাক করলাম। বিস্ময়ের ধাক্কা কাটতে কাটতে বুঝে যাই, একে আমার এত পরিচিত লাগছে কেন – চেহারাটা মিথিলার চেয়ে ধারালো, গায়ের রঙটা তুলনামূলক উজ্জ্বল। লম্বাও একটু বেশি। কিন্তু মিথিলার মধ্যে কি যেন একটা সৌন্দর্য আছে, যেটা এর মধ্যে নাই। কয়েক মুহূর্ত পরে আবিষ্কার করলাম দুইজনের কথাবার্তায়ও অমিল – এই মেয়ে শুদ্ধভাষায় কথা বলে।

“আমার নাম ঊর্মিলা, ওরফে কামারুজ্জামান।”

আমি মাথা নেড়ে বললাম, “তুমি মিথিলার ছোটবোন। একবার দেখা হয়েছিল।”

“জ্বি। বেশিক্ষণ থাকতে পারবো না, গতকাল আমার বিয়ে হয়েছে। জামাইকে সারপ্রাইজ প্রেজেন্ট কিনে দেয়ার নাম করে আপনার সাথে দেখা করতে এসেছি।“

“অসুবিধা নাই। মিথিলা কেমন আছে?“

“আপু মারা গেছে।“

কেন যেন মনে হলো, ঠাস করে একটা পাঁচ টনী ট্রাক আমার কন্ঠনালী দিয়ে নিচে পড়ে গেছে। তবু অবিশ্বাসের সুরে বললাম, “কিন্তু রিপোর্টটা তো ভুয়া।”

“জ্বি, ফটোশপ করা। আমার বিয়েটা যেন হয়, সেজন্য বানানো।”

“আমি এসব ড্রামার আগা-মাথা কিছুই বুঝতে পারতেছি না।“

“বুঝিয়ে বলছি, ভাইয়া। কিন্তু আপনি কাউকে বলতে পারবেন না।“

আমি ঘাড় কাত করে সায় দেই। কেন যেন ভয় হচ্ছে, এই কথোপকথনটা কোনদিন মন থেকে মুছতে পারবো না।

“আপু আসলে ঐ রোড অ্যাক্সিডেন্টে মারা যায়নি… তাকে চলন্ত বাসের মধ্যে গ্যাংরেপ করা হয়েছিল। ঐ ইঞ্জুরি থেকেই সে মারা গেছে।”

“ওয়েট, কি বল্লা, আবার বলো তো? আমি মনে হয় ভুল শুনছি।“

“ঠিকই শুনেছেন ভাইয়া,” মেয়েটা টিস্যুর কোনা দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বলে। “আট মাস আগের ঘটনা। লোক জানাজানির ভয়ে বাসা থেকে থানা-পুলিশ কিছু করেনি। তারপরও কিভাবে কিভাবে যেন লোক জেনে গেছে। আমার এত বছরের বয়ফ্রেন্ড, যার সাথে কিনা শান্তিনিকেতনেও পড়তে গিয়েছিলাম, সে তো ব্রেক-আপই করে ফেললো। বলেছে এরকম ফ্যামিলিতে ওদের বাসা থেকে বিয়ে দেবে না। শেষমেষ আব্বু-আম্মুর পছন্দে বিয়ে করলাম। সম্বন্ধটা যেন টিকে সেজন্য আপুকে নিয়ে একটা ভুয়া রিপোর্ট তৈরি করে ফেক একাউন্ট দিয়ে পোস্ট করেছি…“

আমার মনে হলো, আমি ভাসছি। ঊর্মিলা কথা বলতে থাকে।“প্লিজ ভাইয়া, আপনি কাউকে বলবেন না। আমাদের ফ্যামিলির উপর দিয়ে অনেক গেছে, আর না।”

আমি মাথা নাড়লাম।

“জানেন সানি ভাই,” সে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করে, “আপুর সাথে আমার আসলে কখনোই সম্পর্ক ভালো ছিল না। ও সবসময় এত ভালো ছিল যে আমার মনে হতো, আমাকে খারাপ দেখানোর জন্য এগুলি ওর অভিনয়। অনেকগুলি চ্যারিটির সাথে জড়িত ছিল। সারাক্ষণ খালি মানুষের উপকার করতে চেষ্টা করতো। কারো যেন মন খারাপ না থাকে, সেই চেষ্টা করতো। বিয়ে করতে চাইতো না অবশ্য, জিজ্ঞেস করলে হেসে বলতো, ‘আমার বর এখনো রেডি না।’ আপনার কথাও বলতো, অনেক আগে…”

“কি বলতো?”

“খুব একটা মনে নাই, স্যরি। কিন্তু আপনাকে খুব ভালো মানুষ মনে করতো, ফ্রেন্ড হিসাবে পছন্দ করতো এসব বুঝতে পারতাম… মারা যাওয়ার আগে খুব সম্ভবত আপুর একটা হিন্দু ছেলের সাথে সম্পর্ক হয়েছিল। ঐ ঘটনা ঘটার পরও আপু এক মাস বেঁচে ছিল। পশুগুলি কি যে অবস্থা করেছিল আপুর! আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না। অনেক ফাইট দিয়েছিল, তবু শেষ পর্যন্ত বাঁচতে পারলো না।“

আমি বোবার মতো বসে থাকি।

“শেষের দিকে আপুর মেন্টাল স্টেট খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিল। দিনরাত শুধু চিৎকার করতো আর ঐ হিন্দু ছেলেটাকে ডাকতো। জানেন, এখন এত খারাপ লাগে! খালি ভাবি, কেন আমি আপুর সাথে ভালো রিলেশন রাখলাম না? ইচ্ছে করে আমি নিজেই মরে যাই!”

ঊর্মিলা কাঁদতে থাকে। আমি সান্ত্বনা দেয়ার জন্য কিছু একটা বলতে গিয়েও বলতে পারি না।

শেষে বললাম, “ওর কবর জিয়ারত করতে চাই, কোথায় কবরটা?“

কিন্তু সে চোখ মুছে চোয়াল শক্ত করে বলে – “স্যরি সানি ভাই, বলা যাবে না। তাছাড়া আপনার যা রেপুটেশন… আমার বা আমার ফ্যামিলির সাথে আপনার ইন্টার‌্যাকশন যত কম হয়, ততই মঙ্গল।”

আমি ভেতরে ভেতরে পঙ্গু হয়ে যাই, তবু মাথা নাড়ি।

শেষপর্যন্ত আমাদের দুই প্লেট ফুচকা কেউই স্পর্শ করিনি। বিদায় নেয়ার আগে কেন যেন ঊর্মিলাকে জিজ্ঞেস করলাম – “আচ্ছা, মিথিলা মারা যাওয়ার আগে কি বলতো?”

“কি বলতো মানে?”

“ঐ যে বললা, ও দিনরাত চিৎকার করতো…”

খুব বিরক্ত একটা ভাব করে সে বললো, “ঐ হিন্দু ছেলেটাকে ডাকতো। দিন-রাত ঐ একটা কথাই চিৎকার করে বলতো, আর ভয় পেয়ে কাঁদতো। ‘বিষ্ণু, বিষ্ণু, তুমি কোথায়? ওরা আমাকে খেয়ে ফেলতেছে।’“


কেন এরকম হচ্ছে, আমি বুঝতে পারছি না। আজকাল কোন কিছুই ভালো লাগে না।

ভেতরে ভেতরে আমাকে কি যেন কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। আস্তে আস্তে আমার এত বছরের সাজানো পৃথিবীটা ওলট-পালোট হয়ে যাচ্ছে। এমন তো হওয়ার কথা ছিল না। মানুষ কখনো চেইঞ্জ হয় না। তাহলে আমার মধ্যে এসব কী হচ্ছে? আমি কে হয়ে যাচ্ছি?

কাউকে কিছু বলিনি, গায়ত্রীকেও না। তবু সে আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। আমি নাকি হঠাৎ বোরিং হয়ে গেছি, বা অন্য কারো সাথে প্রেম করে স্বীকার করছি না, বা এরকম একটা কিছু যেটা তার অসহ্য লাগছে। চাকরিটাও ছেড়ে দিয়েছি। সেই খবর শুনে মা জোর করে আমার বাসায় উঠেছে। আমি আপত্তি করে বলেছিলাম – “আব্বার কি হবে?”

মা বললা, “আগে তুই, তারপর তোর আব্বা।”

এই মা কি আমার অপরিচিত? নাকি সে সবসময় এরকমই ছিল? মা আমাকে রেঁধে খাওয়ায়, আমার সেবা-যত্ন করে, আর আমি ভালো হয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে দরজা বন্ধ করে ঘরের মধ্যে পড়ে থাকি। গত তিন মাস ধরে কাঁদতে চেষ্টা করছি, তাতে করে যদি মনটা ডাইভার্ট হয়। কিন্তু চোখদুটো সবসময় খটখটা শুকনা। স্বপ্নে মিথিলাকে দেখবো বলে ঘুমাতে চাই, কিন্তু ঘুমও আসে না।

বিরক্ত হয়ে শেষে বাসা থেকে বের হয়ে ঘোরাঘুরি শুরু করলাম। করোনায় দেশটা এমনিতেই খা খা করছে। অর্থনীতি-ফীতি সব শেষ। তার উপর প্রচন্ড গরম। প্রতিদিন প্রার্থনা করি আজ মুষলধারে বৃষ্টি পড়ুক, কিন্তু এক ফোঁটা বৃষ্টিও পড়ে না।

রিকশায় করে ঘুরতে ঘুরত আজ আজিমপুর কবরস্থানের কাছে চলে এসেছি। ঘামতে ঘামতে বেচারা রিকশাঅলার টি-শার্টে লবণ জমে গেছে। আমি “রাখো, একটা কোক খাবো“ বলে রাস্তার পাশের একটা দোকান থেকে আমাদের দুইজনের জন্য দুইটা কোক কিনে আনলাম। বছরখানেক ধরে রিকশা চালাচ্ছে, অল্পবয়স্ক একটা ছেলে। একটা কোক পেয়েই কি খুশি! প্যাডেল মারতে মারতে গল্প জুড়ে দিলো। আমি হু-হা করে শুনতে থাকি।

একটু পর ছেলেটা গামছা দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বলে, “মামা, যেই গরম, সব ফসল-টসল শ্যাষ!” বাড়িতে তার বউ আছে, একটা বাচ্চা আছে, দেড় পাখি জমি আছে, কি কি ফসল সেখানে হতে পারতো কিন্তু এই গরমে সম্ভব না… হঠাৎ আমার কি হলো, কে জানে – সবকিছু একসাথে মনে পড়ে গেল। ঝরঝর করে আমি কাঁদতে শুরু করলাম। প্রথমে আলতো করে চোখ ভেজা কান্না, তারপর টপটপ করে গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া কান্না, তারপর মুষলধারে কান্না।

রিকশাঅলা ঘাড় ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করে, “মামার কি হঠাৎ কারো কথা মনে পড়ছে?”

আমি চোখ মোছার ব্যর্থ চেষ্টা করে বলি, “না, ফসলের ক্ষয়ক্ষতির কথা শুনে বুকের মধ্যে হু হু করে উঠলো।“

“মন খারাপ কৈরেন না মামা। আপনাদের কি চাষের জমি আছে? দ্যাশে?”

“না নাই।“

“তাইলে?“ সে অবাক হয়।

আমি নির্লজ্জের মতো কাঁদতে কাঁদতে বলি, “কিন্তু থাকতে তো পারতো, তাই না? তোমার মতো দেড় পাখি জমি, একটা ছোট ঘর…”

“তা নিশ্চয়ই পারতো মামা। নিশ্চয়ই পারতো…“

আসিতেছে:

আরো কিছু আধা-খ্যাঁচড়া গল্প

বব ডিলান এবং রবীন্দ্রনাথের দুইটা গানের তুলনামূলক আলোচনা

জাদুবাস্তবতা নিয়ে একটা লেখা…


এই লেখককে আরও পড়ুন